কথোপকথন

নিলু ফেইসবুক ওপেন করে বসে ছিল। কিছু করার নেই আজ। চুপচাপ বসে ফিডগুলো দেখছিল। তখনি মিলি তাকে নক করলো।

মিলি- ‘হ্যালো’

নিলু- ‘হাই, কি করিস?’

মিলি- ‘কিছু না, হাত ব্যথা করছে! খুব’

নিলু- ‘কেন রে, হাতে কি হলে তোর আবার?’

মিলি- ‘কি হলে তা বুঝতেছি না,  শুধু ব্যথা!!’

নিলু- ‘খুব বেশি নাকি?’

মিলি- ‘না-আ.. তা না খুব বেশি না।’

নিলু- ‘ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না, আমাদের শরীরের ব্যথা সহজেই ঠিক হয়ে যায়, এইটা একটা বাচুয়া।’

মিলি- ‘সব ব্যথায় ঠিক হয়ে যায় …’

নিলু- ‘হয়তো। কিন্তু …’

মিলি- ‘কিন্তু কি? মনের ব্যথাও ঠিক হয়ে যায়’

নিলু- ‘তাই! আমি জানি হয় না, আমরা ভুলে থাকি।’

মিলি- ‘হয় হয়, ইচ্ছে করতে হয়, ইচ্ছে করলেই হয়।’

নিলু- ‘সেই ইচ্ছে করানোর উপায় কি আমাকে বলবি?’

মিলি- ‘মানে?’

নিলু- ‘দেখ, তোর হাত ব্যথা করছে ওষুধ খেলে সেরে যাবে, মনের অসুখ কিসে সারে? ক্যাটালিস্ট গুলো কি হতে পারে?’

মিলি- ‘নিজে নিজে ব্যাপারটা ভাবলেই হয়, তুই যে কারণে ব্যথা পাচ্ছিস, সেটাকেনেগেটিভ-লি ভেবে দেখ। আর যা হয়েছে তাকে পজিটিভ-লি বেশি বেশি করে দেখ, ভালদিকগুলোকে হাইলাইট কর। ’

নিলু- ‘তুই পারছিস? খালি জ্ঞান দিস।’

মিলি- ‘আল্টিমেট প্রিন্সিপাল বলে একটা কথা আছে, সেটি দিয়ে একটা ব্যপার তৈরি করলেযদি ব্যপারটা নাইও হয়েও যায়, তার রেমনেন্ট তো থাকবেই।’

নিলু- ‘দেখলি নিজের যুক্তিতে নিজেই হেরে গেলি, আমি ওই তোর রেমনেন্ট এর কথাই বলছি, ওটা মনের মধ্যে সমসময় লেগেই থাকে।’

মিলি- ‘থাকে তবে, সেটাকেও মুছে ফেলা যায়।’

নিলু- ‘সত্যি যায় কি?’

মিলি- ‘যাবে না কেন? অবশ্যই যাবে।’

নিলু- ‘আমি পারি না। ’

মিলি- ‘পারি না কোন শেষ কথা না, আমার ধারণা তুই ঠিক মতো চেষ্টাই করিস না।এখনো ডুবে থাকিস ওর মাঝে। জীবনটা তো এতো ছোট না, একটা ঘটান ঘটতেই পারে।পেছনে কি ছিল সেটা নিয়ে এতো ভাবলে সামনে দেখবি কি করে?’

নিলু- ‘দোস্ত, আমি চেষ্টা করি, কিন্তু দেখ পারি না, মনের মধ্যে খালি খচ খচ করে। কিন্তু আমি সত্যিই ভুলে যেতে চাইরে।’

মিলি- ‘এই জন্যে আরও বেশি বেশি করে চেষ্টা করতে হবে, ফেইসবুকে কাওকে পছন্দ হয়নাই, অন্য কারো সাথে টাইম দে, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে সব।’

নিলু- ‘(হাসির ইমো) আমার তোরে পছন্দ। অনেক… চল আমরা পালিয়ে যাই। ’

মিলি- ‘দিবো থাপ্পড়, আমি তোর থেকে বয়সে তিন মাসের বড়ো, মনে থাকে না সে কথা , আমাকে আপু ডাকবি।’

নিলু- ‘ওরে আমার আপুরে..। আচ্ছা আপু বলেন, আপনি এতো জ্ঞান দিলেন, আপনি ভুলতে পারছেন?’

মিলি- ‘পারি নাই তাই কি হইছে, এখন তো সেসব নিয়ে ভাবি না। আমি আর এসবের মধ্যে নাই।’

নিলু- ‘মিথ্যে কথা, আমি জানি তুই এখনো ভাবিস।’

মিলি- ‘একদম যে ভাবি না তা না,  মাঝে মাঝে ওর কথা খুব মনে পরে। আমাদের খুব ভালকিছু সময় ছিলরে, সেগুলো কথা মনে পরে। তখন খুব কান্না পায়। মাঝে মাঝেকাঁদিও। কিন্তু জানি এসব অর্থহীন। ’

নিলু- ‘আমরা সবই বুঝি, কিন্তু কিছুই করতে পারি না, বলা একদম সহজ, করা অনেক কঠিন, বুঝলি?’

মিলি- ‘তা কঠিন, কিন্তু কথায় আছে না, কঠিনেরে আমরা করবো জয়, একবার জয় হয়ে গেলেই তো হালকা হয়ে যায়’

নিলু- ‘হুম, কিন্তু কি করবো বল, মনটা যে কি চায়, নিজেই জানে না, কোথা থাকে তার হদিস পাই না।’

মিলি- ‘আমার কি মনে হয় জানিস, সব কিছুই নরমাল, সব কিছু ঠিক আছে, যা হইছে তাহওয়ার ছিল, আর যা হয়নাই, তা হওয়ার ছিল না, এই সত্যটা মেনে নিলে ঝামেলা থাকেনা।’

নিলু- ‘হা হা হা, ঠিক বলছিস। আমি সবসময় সব কিছুকেই পজিটিভ-লি নেই, অপটিমিস্টিক ভাবে চলতে চেষ্টা করি।’

মিলি- ‘তুই কিন্তু খারাপ আছিস, পরীক্ষার আগের দিনও আমার সাথে কথা বলছিস অনেক্ষণ। সিরিয়াস হ, এইটা তোর অপটিমিস্টিক চলন?’

নিলু- ‘আরে… পরীক্ষা, পরীক্ষা থেকে কি তুই কম গুরুত্বপূর্ণ।’

মিলি- ‘সময় খুব খারাপ জিনিস, কেমন ছন্দময় একটা সময় ছিল, আর এখন সব কিছু মাঝেমাঝে গুবলেট হয়ে গেল। একসময় আমি ওর জন্য কতটা পাগল ছিলাম, তুই চিন্তা কর, ওযা চাইতো তাই করতাম। আর কি না আমাকে এভাবে রেখে চলে গেলো। না ওর কথা আরমনে করতে চাই না। ভাবলেই রাগ ধরে। ’

নিলু- ‘হা হা.. ’

মিলি- ‘জানিস নতুন একজন ছেলে আমাকে ইদানীং জ্বালায়। খুব পাগলামি করে’

নিলু- ‘তোরে সবাই জ্বালাবে এইটাই তো ঠিক, আমি কি কম জ্বালাই নাকি, কি বলেছিস ওকে?’

মিলি- ‘ওকে একদিন ডিরেক্টলি বললাম, দেখো, আমি যেহেতু হৃদয়ের খেলা একবার খেলেছি, এবং এই খেলায় আমি ঠকেছি, আমি আর এই খেলায় যেতে চাই না। এখন যা হবেনিতান্তই সেটেলমেন্ট। আমি ওই কাওয়ার্ডটাকে যতটা ভালবেসেছি, নতুন করে অতটাকাও বাসতে পারবো না। সত্যি কথা কি জানিস, আমি ওকে যতটা ভালবাসতাম, তারপরদ্বিতীয় যাকে ভালবেসেছি, সে হলো তুই।’

নিলু- ‘ কি বলিস, আজ নিশ্চয় সূর্য উঠেই নি। আমি নিশ্চয় স্বর্গে বাস করছি।’

মিলি-‘ন্যাকামি করবি না, তুই ভাল করেই জানিস, বুঝেও না বুঝার ভান করিস, রাগ লাগে।’

নিলু-‘তাই নাকি, রাগলে তোকে ভালই লাগে কিন্তু।’

মিলি-‘লাগবেই তো, আমি তো আর অসুন্দর না।’

নিলু-‘হুম তুমি এতো সুন্দর, দেখলেই মরে যেতে ইচ্ছে করে।’

মিলি-‘দেখ ফাজলামি হচ্ছে। ’

নিলু-‘হচ্ছেই তো। আচ্ছা বাদ দিলাম, এখন বল, তারপর কি বললি ঔই ছেলেটা কে?’

মিলি-‘তোর কথা বললাম, যে আমি তোকে ভালবাসি, এখন যদি কাও ভালবাসি সেটা হবে তোর মতো।’

নিলু-‘আমর মতো মানে?’

মিলি-‘মানেতোকে যতটুকু ভালবাসি সেইরকম। শুধুই বন্ধুত্ব। তোকে আমি অনেক ভালবাসি, কিন্তু দেখ, তোকে আমার বয়-ফ্রেন্ড ভাবতে গেলে হাসি পায়। ’

নিলু-‘হুম..’

মিলি-‘তারপর, আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমার কেমন ছেলে পছন্দ?’

নিলু-‘তুই বললি?’

মিলি-‘হুমবললাম। বললাম যে, তাকে অবশ্যই আমার থেকে কম সুন্দর হতে হবে। ফর্সা ছেলেআমার পছন্দ না, ডার্ক হতে হবে। এবং আমার এইজ-এর হতে হবে বা একটু বেশি। আমিঅনেক ডমিনেটিং। বয়স বেশি হলে ডমিনেট করা যাবে না। ’

নিলু-‘তারপর-’

মিলি-‘তারহাইট হবে আমার থেকে একটু লম্বা, খুব বেশি লম্বা ছেলে আমার পছন্দ না। আরতাকে অবশ্যই আমাকে অনেক অনেক ভালবাসতে হবে, এবং আমার সব দৌড়াত্ন সহ্য করতেহবে।’

নিলু-‘কি বললো সে?’

মিলি-‘হা হা, সে সব কিছুতেই রাজি, সমস্যা হলো সে তো ডার্ক না, তাই বলে কিনা, প্লাস্টিক সার্জারী করে কালো হয়ে যাবে। হাহা ’

নিলু-‘হুম, ভালই হবে, রাজি হয়ে যায়।’

মিলি-‘তাই, রাজি হয়ে যাবো, ইয়েস বলে দেই কি বলিস?’

নিলু-‘হুমবলতে পারিস। কিন্তু আমার চিন্তা আসলে অন্য কিছু, ইংরেজি ডিকশনারিতে একটাশব্দ আছে, ইনফাচুয়েশান, জানিস নিশ্চয়। এইটা তা্‌ই হতে পারে। জানিসতো ওয়ালেযে পেরেক তাড়াতাড়ি ঢুকে সেটা বেরিয়েও আসে তাড়াতাড়ি।’

মিলি-‘হুম, কিন্তু ও ওরকম না, অনেক ভেবে চিন্তে কথা বলে। তবে অবশ্য আমাকে বলেছে, আমার কনফিউশন থাকলে বলতে।’

নিলু-‘তুই কি বলিস, তোর কনফিউশন আছে?’

মিলি-‘আসলেকি জানিস, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ওকে মনে হয় এখনো ভালবেসে উঠতেপারি না। ওর সাথে কথা বলতে ভাল লাগে, সময় কাটাতেও। তারপরেও কেমন জানি।ভালবাসা কিন্তু অন্য জিনিস। এইটা এতো সহজে হয় না। একের সাথে অনেক কালথেকেও অনেক সময় হয়ে উঠে না। কিন্তু হাজার মাইল দুরে থেকেও ভালবাসা যায়। ’

নিলু-‘হুম, তু বরং সেটেল ম্যরিজ করে ফেলিস। সেটেলমেন্ট-ই বেটার। রিলেশন ভেঙ্গে পরারসম্ভাবনা কম থাকে।  আর ভেঙ্গে পরলেই খুব বেশি পিছুটান থাকে না।’

মিলি-‘হুম। হয়তো কিন্তু আমি কি চাই নিজেই এখনো বুঝে উঠতে পারি না। আসলে মেয়েদের মন অনেক কমপ্লেক্স।’

নিলু-‘ হা হা, এইটা তুই বললি, আমি তো জানি, এইটা মেয়েদেরকে বললে রেগে যায়।’

মিলি-‘হুম .. কিন্তু সত্যি কিন্তু তাই, তুই দেখ, তুই আমার কত ভাল বন্ধু, আমরা একসাথেকত সময় কাটিয়েছি, কিন্তু তুই কি আমাকে বুঝতে পারিস?’

নিলু-‘বুঝি হয়তো, আধো আধো। ’

মিলি-‘বুঝিস না, আমি জানি তুই বুঝবি না।’

নিলু-‘আচ্ছা আমি কে বলতো?’

মিলি-‘তুই হচ্ছিস আমার আকাশে একটা নক্ষত্র। যা দূরে থাকলেই ভাল লাগে, তোর কাছে এলে পুরে যাই।’

নিলু-‘তাই, তালে তোর কাছে আমার যাও উচিৎ না কখনো।’

মিলি-‘আসিস না প্লিজ।’

নিলু-‘আসবো না। কিন্তু তুই ভাল থাকিস। প্লিজ। তুই খারাপ থাকলে আমার কষ্ট হয়।’

মিলি-‘কেন হয় রে?’

নিলু-‘থাক না, সব প্রশ্নের উত্তর জানতে নেই।’

মিলি-‘তুইসবসময় আমাকে বলিস, ভালবাসা কি জিনিস তুই জানিস না, অথচ তোকে ঘিরে এতোভালবাসা কেন রে? যব যায়গায় স্পর্শ রেখে যাস অথচ তুই নিজেই বলিস বুঝিস না।’

নিলু-‘হুম, বেশি বুঝা ভাল না রে, কম বুঝবি তাই ভাল’

মিলি-‘ওই থাক, আজ যাই রে। থাক। অন্যদিন কথা হবে।’

নিলু-‘হুম টাটা, ভাল থাকিস।’

মিলি- ‘তুই ও থাকিস। টাটা বাই।’

 

ভুতের নৌকা

আজকে একটা ভুতের গল্প লিখবো। শুরুতে বলে নেওয়া দরকার, ভুতের আইডিয়াটা কিভাবে আমার মাথায় এলো। আমি তখন অনেক ছোট সম্ভবত ১২ তে পড়ি। আমি তখন গ্রামের বাড়িতে। রাত তখন ৯ টা হবে, আম্মু, আমি আমার নানুনানী এবং আমার নানীর একটা ভাই উঠোনে বসে আছি, তখন আমের সময়, আমরা সবাই মিলে আম খাচ্ছি। আমার ছোটবোন পাশের ঘরে একটা রুমে ঘুমুচ্ছে। ওর বয়স তেমন বেশি নয়, কেবল মাত্র কথা বলা শিখেছে, আর একটা বিশেষ জিনিস শিখেছে সেটা হলো, আমাকে খামচি দেওয়া। তখন মনে হতো, ওর তিনটা কাজ, খাওয়াদাওয়া আর, ঘুমানো আর আমাকে খামচি দেওয়া। ওর এই কাজে আমি বিরক্ত হয়ে ওর নাম দিয়েছি করল্লা। এই বিদঘুটে সবজীটা আমার খুবই অপছন্দের। আমি কখনোই খেতে চাই না। কিন্তু আমার আম্মু, কেন জানি, এই বিশেষ সবজীটা সব সময় খেতে বলেন। কোন কোন সময় আমাকে ভুলিয়ে খাইয়ে দেন, আর যখন আমি খেয়ে উঠি, তখন বলে দেন, আর এমন হাসি দেন, যাতে করে মনে হবে আম্মু বিশ্বজয় করে ফেলেছে এই কাজটা করে। যাহোক, ভুতের অংশে চলে আসি। আমার নানীর ভাই, আম খেয়ে উঠে পরলেন। এবার তিনি বাড়ি যাবেন। উঠে বের হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ চিৎকার, “বুঝান আইলি না, আমাকে মাইরা ফালাইলো”। আমার নানীকে তার ছোট ভাই বুঝান ডাকে। যাহোক, গ্রামের বাড়ি, চিৎকার শুনে চারদিকে সবাই ছুটে চলে আসছে, সবাই ভাবছে চোর চোর। এসে দেখে যে যায়গায় উনি ভয় পেয়েছেন, সেখানে দস্তাদস্তির চিহ্ন। সুতরাং এখানে যাই হোক, বেশ খানিক্ষণ দস্তাদস্তি হয়েছে। মজার ব্যপার হলো তাকে(আমার নানীর ভাইকে) কিছু প্রশ্ন করা হলে কিছু বলতে পারেন না, তার কিছু মনে নেই। সবাই প্রথমে ভাবছিল চোর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্পটি হলো, এটা মোটেই চোর নয়, পিশাচ ছিল। আমাদের বাড়িটির পেছনে একটা বাশঝাড় আছে, সেইখানে সে থাকে। আমাদের বাসার কাওকে কোন রকম ভয় দেখায় না, ভদ্রগোছের পিশাচ। কিন্তু অনেকেই নাকি রাস্তায় দেখেছে এই পিশাচকে।

সুতরাং আমার ছোট বেলাটা ভুত না দেখেই ভুতের ভয়ে কেটেছে। এখন আমাকেও নাকি ভুতে ধরেছিল, সেই গল্প বলি, আমার ধারণা আমাকে ভুত ধরে নি, ধরেছিল একটা পরি, পরিরা নাকি সুন্দর এবং ভদ্র ছেলেদের ধরে নিয়ে তাদের দেশে চলে যায়। তারপর তাদের দেশে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলে, তারপর সংসার শুরু করে, তাদের বাচ্ছাকাচ্চা হয়। কিন্তু আমাকে মনে হয় ধরে নিয়ে যেতে পারে নি, না পেরে ভাল করেছে, কারণ আমার জন্যে নিশ্চয় একটা মানুষ পরী অপেক্ষা করে বসে আছে (আর বলা যাবে এই গল্প, অতি গুপনীয়)। আমি একদিন ঘুমিয়েছি, আমি তখন ক্লাস ৩৪ এ পড়ি। আমার জ্বর এসেছে, বেশ জ্বর, তাপমাত্রা একশ এর উপরে। শুয়ে আছি বিছানায়। সবাই জানে, ঘরে শুয়ে আছি। এইটুকু আমি জানি, বাকিটুকু শুনা গল্প। আমি যে ঘরে ঘুমাচ্ছিলাম, সেই ঘরের পেছনে একটা বড়ো আম গাছ আছে। আমি উঠে, সেই গাছের দিকে যাচ্ছি, আমার খালামনি সেটা দেখে আমার পিছু নিয়েছেন। আমি সেই গাছের কাছে এসে গাছে উঠার চেষ্টা করছি, আমি কখনো গাছে উঠিনি, উঠতে পারি না, আমি কখনো উঠার চেষ্টাও করি নি। উনি চিৎকার দিলেন। তারপর, যা হলো, আমাকে অনেক কষ্টে গাছ থেকে নামিয়ে বিছানায় শুয়ে দিয়ে প্রায় ঘণ্টা দুই পানি ঢালা হলো। তারপর আমি যখন চেতনা ফিরে পেলাম, তখন কিছু জানি না, আমার পাশে সবাই দাড়িয়ে কেন, প্রশ্ন করলাম। পরে আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হলে সবাই বলে আমাকে নাকি ওই পিশাচটা ধরেছিল। হা হা হা

যাহোক এগুলো শুনা গল্প এবং ছোট বেলার গল্প। এবার একটু বড়ো বেলার গল্প বলি। আমি ঈদ সব সময় গ্রামের বাড়িতে করি, এবারও করেছি। আগের দিন সন্ধ্যায় এসেছি। ঈদ এর দিন সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে, ঝুম ঝুম বৃষ্টি, অসাধরণ একটা দিন। কিছুক্ষণ ছাতা নিয়ে বাইরে দাড়িয়ে বৃষ্টি দেখেছি। সামনে বিশাল ধান ক্ষেত। মনে অনেক আনন্দ, এই আনন্দ দেখা যায় না, শুধুমাত্র অনুভব(feel) করা যায়।

সন্ধ্যায় আমি আর আব্বু বের হয়েছি, বৃষ্টির মধ্যে, শেরপুর আসবো। আমাদের বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা পথ হেঁটে আসতে হয় স্ট্যান্ডএ। স্ট্যান্ড এসে চা খেলাম। এই দোকানে চাএর বিল আমাকে কখনো দিতে হয় না। চাএর দোকানদার আমাকে কখনো বিল দিতে দেয় না অথবা পরিচিত কারো সাথে দেখা হয়ে যায়, যিনি নিজের আগ্রহে চায়ের বিলটি দিয়ে দেয়। জিনিসটি মজার। শেরপুরে একটা মিষ্টির দোকান আছে, চারু সুইটস। এই দোকান থেকে আমি মিষ্টি কিনে থাকি, এই দোকানের ক্যাশবক্সে যিনি বসেন, এই ভদ্রলোক আমি গেলেই প্রশ্ন করবেন, আমি এখন কোথায় থাকি, কি করছি। প্রতিবারই প্রশ্ন করেন, এবং উনি আমার কাছে মিষ্টির দাম সবসময় অন্যদের থেকে কম করেন, কেন এমনটা করেন আমার জানা নেই। কিন্তু এমন ব্যপার মাঝে মাঝেই হয়। যাহোক, স্ট্যান্ড এ এসে দেখি, যাওয়ার কোন উপায় নেই। কিসে করে শেরপুর এ আসবো সেটা নিয়ে আমি আব্বু দুজনেই বেশ চিন্তিত। এমনিতে সন্ধ্যা শেষ হয়ে যাচ্ছে, তার উপর বৃষ্টি। এই রোডে একসময় বাস চলতো, একটু পর পর বাস আসতো, ইদানিং অদ্ভুত একটা কারণে বাস বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যপারটা এমন হয়ে ধারিয়েছে যে, অনেক অনেক আগে এই রাস্তা ধরে গরু গাড়ি চলতো, এমন করে বলবে হবে, অনেক অনেক দিন আগে এই রাস্তায় বাস চলাচল করতো। কোন বাস নেই, সবাই সিনএনজি চালিতো অটোতে চলাফেরা করে। আর একটা গাড়ি আছে যাকে সবাই বলে বডবডি“, এই অদ্ভুত প্রাণিটাতে উঠার প্রশ্নই উঠে না, খুবই বিপদজনক জিনিস। আমি এমনিতে গাড়িতে উঠতে বিশেষ ভয় পাই। আজ কোন সিএনজি নেই। দাড়িয়ে আছি তো আছিই। অনেকক্ষণ পর একটা রিক্সা এলো, ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা, এই উদ্ভুত যানে উঠে বসলেই মনে হয় এখনি ভেঙে পরবে কিংবা উল্টে যাবে নতুবা বাতাসে উড়ে যাবে। কিন্তু উপায় না দেখে উঠে পরলাম। রাস্তা ভর্তি গর্ত, গর্তের মধ্যে যখনি চাকা পরে, আর অমনি মনে হয় এই বুঝি এটা উল্টে গেলো। আমরা বেশ খানিকটা পথ আসলাম এইভাবে বেশ কয়েকবার উল্টে যাওয়ার ভয় নিয়ে। আমরা নামলাম, করুয়া বাজার। এইখান থেকে অটো (সিএনজি চালিত) নিয়ে শেরপুর যাবো। বাজারে দুইটা অটো। একটাকে বললাম, সে যাবে না, কোন ভাবেই যাবে না। সেখানে আমাদের একটা পরিচিত লোকের সাথে দেখা হলো, তিনিও শেরপুর যাবেন। এক সাথে যাওয়া যায়। দ্বিতীয় যে অটো আছে, তার চালককে তিনি বললেন যাবে কিনা, অটো যাবে না। কোন ভাবেই যাবেন না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত উনার অটোতেই আমরা চরে বসলাম। আমরা যখন উঠলাম, উনাকে বললাম, প্রথমে রাজি হলেন না কেন। উত্তরটা হলো, “এই লোক ভাড়া কম দেয়, তাছাড়া আমার পরিচিত লোক, তাই না বলছি।হা হা। যাহোক, রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। তাকে বললাম, ধীরে ধীরে চালাতে, আমাদের কারো তাড়া নেই। এভাবে আস্তে আস্তে আমরা আসতে লাগলাম।

একটু পরেই কুড়িকাহনীয়া ব্রিজ, স্টিলের ব্রিজ, ভগ্নদশা, আমার মাঝেই মাঝেই মনে হয় এই ব্রিজটা একদিন হঠাৎ করে খুলে পরে যাবে। অনেক দিন থেকেই ভাংগা অবস্থায় পরে আছে, কিন্তু ঠিক করার নাম গন্ধ নেই, একবার আমি আর খালামনি ফিরছিলাম শেরপুর এ, তখন অটোর একটা চাকা এই ব্রিজের মধ্যে পরে গিয়েছিল, আমি খালামনি দুজনেই ব্যাথা পেয়েছিলাম।

অটোর ওয়িন্ডশিল্ড বৃষ্টির পানিতে ঘোলা হয়ে গেছে, খুব বেশি দেখা যায় না, ড্রাইভারকে বললাম পরিষ্কার করতে, ড্রাইভার বলে, ওয়াইপার নষ্ট, কি আজব। এমনিতে রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ, তারওপর ইলশেগুড়ি, অর্ধেকটা ভিজে গেছি। অটোর হেড লাইট দিয়ে বেশি দূরে দেখাও যায় না। কেন এমন প্রশ্ন করতেই ড্রাইভার সুন্দর একটা ব্যাখ্যা দিলেন। ব্যখ্যাটি আমার মনে নেই। এভাবেই যাচ্ছি। একটু পর পর চাকা গর্তের মধ্যে পরে যাচ্ছে, আর আমি ভয়ে শিওরে উঠছি। এখনি বুঝি উল্টে যাবে। এর মাঝে চারটা লাইট দেখা গেলো দূর থেকে, চিন্তাই পরে গেলাম, একটা গাড়ির দুইটা লাইট থাকার কথা, দেখা যাচ্ছে চারটা লাইট। একটা গাড়ির চারটা লাইট কিভাবে হয়! ধীরে ধীরে কাছে এসে বুঝতে পারলাম গাড়ি আসলে দুইটা, এই জন্য চারটা লাইট। কিন্তু দূর থেকে অন্যকিছু মনে হচ্ছিল। পাশ দিয়ে যখন গাড়ি গুলো চলে গেলো, মনে হচ্ছিল এখনি বুঝি অটোর গায়ে লাগিয়ে দেবে, আর সাথে সাথে অটো উল্টে যাবে। এভাবে আরো বেশ খানিকটা পথ আসলাম। রাস্তা বেশ অন্ধকার। অনেকক্ষণ কোন গাড়ি আসছে না। পুরো রাস্তাজুড়ে একটা অটো। রাস্তার একপাশে বেশ খানিকটা জঙ্গল এর মতো, মূলত বাশঁঝাড়, এর একপাশে একটা ছোট্ট নদী। নদীর পাড় ঘেসেই রাস্তা। রাস্তাটি একটু বাকানো, আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়, হঠাৎ করে কোন গাড়ি এসে নদীতে পরে যাবে, এই যায়গাটা বেশ ভয়ের এবং যখন এই যায়গায় আসি, আমি বেশ খানিকটা ভয় পাই। আজো পাচ্ছি, আর তখনি ধপ করে গাড়ির হেড লাইট অফ হয়ে গেল। একদম অন্ধকার, ড্রাইভার খানিকটা চালিয়ে গাড়ি বন্ধ করে দিলেন। আমি বললাম, হেডলাইট অফ করে দিলেন কেন, উনি বললেন, বন্ধ হয়ে গেছে, আমি একটু ভয় পাচ্ছি, অন্ধকারে যদি ছিনতাইকারী ধরে। আমি আর আব্বু নেমে পরলাম সিএনজি থেকে। রাস্তার পাশে দাড়ালাম যাতে করে ড্রাইভার হেডলাইট ঠিক করে। রাস্তা থেকে নদীর পানি দেখা যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি, আর ভাবছি। নানা রকম কিছু। ভয় ভয় লাগছে। তবে আমি ভিতু প্রকৃতির নয়, যেখানে ভয় পাওয়া উচিৎ সেখানে ভয় পাই, বাকি সময় পাই না। এই না পাওয়া ভয়ের মধ্যে ভুতের ভয়ও আছে, আমার খুব ইচ্ছে ভুতের সাথে কথা বলা। ভুতরা নাকি আগাম অনেক কিছু বলে দিতে পারে, আমি ভুতের দেখা হলে কিছু জিনিস আগে ভাগে জেনে নিতাম। আমি নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ করে দেখলাম, পানিতে একটা নৌকা, কেও একজন নৌকা চালাচ্ছে, আমি আব্বুকে বললাম, দেখো, একটা নৌকা। আব্বু বলল কই, কই, আমি বললাম, ঐ যে। আব্বু দেখে নি, আমি তাকিয়ে আছি, কিছুক্ষণ পর দেখি আরো আরেকটা নৌকা। কিছুক্ষণ আরো একটি। আমি আব্বুকে বললাম, দেখো দেখো তিনটি নৌকা। আব্বু বলে, কোথায় তোমার নৌকা, কোন নৌকা নেই, এইখানে নৌকা কই পেলে তুমি? কি আশ্চর্য আমি তিনটি নৌকা দেখলাম। আব্বু একটাও দেখতে পায় নি। আমি এবার পেছন দিকে তাকালাম, ড্রাইভারকে বললাম, আপনার হেডলাইট ঠিক হলো, ড্রাইভার বলে, আরেকটু সময় লাগবে। আমি আবার নদীর পানির দিকে তাকালাম, কি আশ্চর্য একটা নৌকাও নেই। বৃষ্টি পরছে, বৃষ্টিতে ভিজে গেছি প্রায় পুরোটা।

তারপর ড্রাইভার হেডলাইট ঠিক করে ডাকলেন। আমরা আবার উঠে বসলাম অটোতে। কিছু দূর আসতেই একটা ব্রিজ, আন্ডার কনস্ট্রাকশান। এই ব্রিজ অনেকদিন থেকেই পরে আছে এভাবে, মাস ছয়েক আগেও এমনটা দেখেছি, কিন্তু কিভাবে কাজ এগুচ্ছে সেটি নিয়ে চিন্তা করলাম আর চিন্তা করলাম না। ব্রিজের পাশ দিয়ে নিচে একটা রাস্তা করা হয়েছে। বেশ ঢালু সেই রাস্তা। মেইন রাস্তার সারফেইস থেকে স্লোপ ২০ ড্রিগ্রি হবে, স্লোপ ৫ ডিগ্রি হলেই হাটা সমস্যা হয়ে যায়, গাড়ি কিভাবে ঠিক থাকবে সেইটাই চিন্তা করছি, সবচেয়ে সমস্যা হবে, মুখোমুখি দুইটা গাড়ি আসলে। সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেই পার হলাম। অটো অনেক কষ্ট করে রাস্তায় উঠে পরলো। মনের মধ্যে ভয় এখন যদি অটো বন্ধ হয়ে যায় কিংবা হেডলাইট আবার নষ্ট হয়ে যায়।

এরপর এইভাবেই বাসায় এলাম।

বাসায় এসে আব্বু জিজ্ঞাসা করলাম, আব্বু তুমি নৌকা দেখো নি। আব্বু বলল, দেখছি, কিন্তু তুমি ভয় পাবে বলে না করেছি। সেগুলো ভুতের নৌকা ছিল।

একটি পরিত্যক্ত চায়ের কাপ

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এ একটা টার্ম আছে, লুজলি কাপলড। এর মানে হলো, দুইটা সফটওয়্যার কম্পোনেন্ট একটা আরেকটার সাথে খুব একটা নির্ভর করে থাকবে না। নিজেরা স্বাধীনভাবে চলতে পারবে, দরকার হলে একে অপরের সাহায্য নিতে পারবে, কিন্তু কেও কারো উপর খুব বেশি নির্ভর করবে না। আমার বন্ধু সফিক, তার ধারণা মানুষের সম্পর্কগুলোও হওয়া উচিৎ লুজলি কাপলড। এতে করে সমস্যা কমে। কেও কারও উপর পুরাপুরি নির্ভর করে বসে থাকলে অনেক সমস্যা। যেমন সে ইচ্ছে করলেই যা খুশি করতে পারবে না, তার কোন কাজের জন্য যে তার উপর নির্ভর করে বসে থাকবে তার উপর তার প্রভাব পরবে।

শফিক আমার ছোট বেলার বন্ধু। এখন অবশ্য অনেক ব্যস্ত থাকে বলে তার সাথে যোগাযোগ হয় না, কিন্তু শফিকের মা, আন্টি আমাকে অত্যধিক স্নেহ করে বলে সেই লোভে মাঝে মাঝে ওর বাড়িতে যাই। হয়তবা দেখা যায়, শফিকের সাথে দেখায় হয় না, আন্টির সাথে কথা বলে চলে আসি। শফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে বসে আছে দু-বছর হলো। বসে আছে বলতে চাকরি বাকরি করছে না। তো একদিন ওর বাসায় গেলাম। আন্টির সাথে এই কথা সেই কথা বলতে বলতে শফিকের কথা আসলো। আন্টির ইচ্ছে শফিককে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়া, কিন্তু শফিক কোন ভাবেই রাজি না। আমাকে বললেন, আমি যেন তাকে রাজি করাই। আমি জানি যে মহান দায়িত্ব আন্টি আমাকে দিলেন, তার একটুও আমাকে দিয়ে হবে না, কারণ আমি শফিককে রাজি করাতে পারবো না। ওর মহান মহান ফিলোসফি দিয়ে আমাকে এতো বেশি বোর করে ফেলবে যে, আমি আর ওর সামনে বসে থাকার সাহস দেখাবো না। তবুও আন্টির কথা মতো ওর সাথে দেখা করতে গেলাম। শফিকের দুইটা ঘর, একটিতে ঘুমায়, অন্যটিকে তার ল্যাব রুম বানিয়েছে। এইটাকে ল্যাব রুম না বলে স্টোর হাউজ বললে খুব একটা মিথ্যা বলা হবে না। রুমে অসংখ্য ইলেক্ট্রিক যন্ত্রপাতি, ক্যাবল, বই এ ঠাসা, রাজ্যের জিনিসপত্র। দুই তিনটা খুলা সিপিইউ।

ওর রুমে ঢুকলাম।

শফিক মনিটরের স্ক্রিন এ দিকে তাকিয়ে আছে, আর কি যেন টাইপ করছে, তিনটা স্ক্রিনে নানা রকম টেক্সট। এগুলো আমি বুঝি না। শুধু বুঝলাম, জটিল কোন প্রোগ্রামিং করছে সে। মেঝেতে ইলেকট্রিক ফ্লাক্স, কম্পিউটার টেবিলে তিনটা কাপ, দেখে মনে হবে এগুলো এখনি শেষ করা হয়েছে।

আমি গিয়ে গলা খাঁকারি দিলাম। কিন্তু ও বুঝল না। ও ওর মতো কাজ করে যাচ্ছে, আমি কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে যখন দেখলাম এইভাবে কাজ হবে না, তখন ওর পিঠে হাত দিলাম। মোটা চশমার পরে আছে সে, আমার দিকে তাকাল-

‘ও তুই কখন এসেছিস?’

‘অনেকক্ষণ, এইখানে দাড়িয়ে কি করছিস দেখছিলাম।’

‘ও, জটিল একটা কাজ করছি, আচ্ছা বোস।’

ও আমাকে বসতে বলল, কিন্তু কোথায় বসবো বুঝলাম না, ওর রুমে আর কোন চেয়ার নেই। আমি এদিক ওদিক তাকাতেই বলল, – ‘ আমার রুমে গিয়ে বোস, এই রুমে চেয়ার ইচ্ছে করেই রাখি না, কেও এসে বসে থাকলে আমার কাজের ডিসটার্ব হয়।’

আমি ওর রুমে গেলাম। এই রুমে মানুষ থাকতে পারে বলে মনে হয় না। বিছানা এতো অগাছালো, দেখে মনে হবে, ইচ্ছে করেই সে অগোছালো হয়ে থাকে। বিছানা ভর্তি বই আর বই, এর অনেকগুলাই খুলা। তবুও বসলাম। বই গুলার মাথামন্ড কিছু বুঝলাম না। আমার বুঝার কথা না, সবই টেকনিক্যাল বই। বসে থেকে বইগুলা নাড়াচাড়া করতেছিলাম। কতক্ষণ বসে থাকা যায়, তারপর আবার ওর ল্যাবে এলাম,

‘শফিক তোর সাথে একটু কথা ছিল, একটু আয়।’

‘কি কথা বুঝছি, মা পাঠিয়েছে তো, আচ্ছা পাঁচ মিনিট বোস,আসতেছি।’

আবার বসলাম,ওর পাঁচ মিনিট কতক্ষণে শেষ হয়, কে জানে।

আমি আরও প্রায় কুড়ি মিনিট বসে আবার ল্যাব এ এলাম।

‘শফিক!’

‘দোস্ত সরি, একটা ইন্টারেস্টিং কাজ করছিলাম। একটা গেইম লিখেছিলাম, সাইন্স-ক্রাফট। মজার একটা গেইম, তোর তো আইফোন নাই, তাহলে তোরে দিতে পারতাম। গেমটা শুরু হয় এইভাবে, মনে কর, তুই আদিম মানুষ, তোকে ধীরে ধীরে আধুনিক হতে হবে। তোকে জংগলে ছেড়ে দেওয়া হবে, এর পর তুই নানা রকম টেকনোলজি আবিষ্কার করে করে বর্তমানে চলে আসবি। বর্তমানে এলেই গেইম ওভার। অলরেডি দশ লক্ষ্য কপি ডাউনলোড হয়ে গেছে। একটা খুব ক্রিটিক্যাল বাগ রিমুব করলাম।’

আমার গেমিং এ কোন ইন্টারেস্ট নেই, তাই কিছু বললাম না।

‘এখন বল কি বলবি।’

‘এমনি কথা বলতে আসছি, তোর সাথে কতদিন দেখা-সাক্ষাৎ না।’

‘তুই তো আমাদের বাসায় আসিস, মার সাথে দেখা করে চআসিসলে যাস, আমার সাথে কথা বলতে আসিস না’

কথা সত্য, কিন্তু এই পাগলের সাথে কথা বলতে কে আসতে চায়।

‘তো এখন কি করছিস, চাকরি বাকরি কিছু করবি?’

‘না, চাকরি দিয়ে কি করবো, এমনিতেই আমার ভাল ইনকাম হচ্ছে, মাসে মোটামুটি ১৫০০-২০০০ ডলার আসে, পুরোটাই তো জমে যাচ্ছে, বাপের হোটেলে বসে বসে খাচ্ছি।’

আমি কথা বলার সুযোগ পেলাম, ‘আর কতদিন এইভাবে চলবে, এইবার বিয়ে-সাধি কর। আমরা একটু পেট পুরে ভুড়িভোজ করি।’

‘বুঝছি, মা তরে এইগুলা বলতে পাঠাইছে, বিয়ে করবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কিন্তু মার জালাতনে আর পারছি না, প্রতিদিনই এক প্যাঁচাল, তার নাতির মুখ দেখেতে ইচ্ছে করে, কি যে করি।’

‘ঠিক ই তো আছে, বিয়ে করতে হবে না, তাছাড়া আন্টিরও তো সখ আহ্লাদ আছে, নাতিদের নিয়ে উনি ফুর্তি করবে।’

‘তো আন্টিকে খুশি করতে গেলে তো আমার বারটা বেজে যায়, শোন বিয়ে যখন করতেই হবে, সুতরাং তোকে বলে রাখি, আমাদের রিলেশান হবে লুজলি কাপলড। লুজলি কাপলড মানে বুঝছি, আমাদের মধ্যে কোন ডিপেন্ডেন্সি থাকবে না। ও ওর মতো চলবে, আমি আমার মতো, কেও কাওকে ডিস্টার্ব করবো না। মোস্ট ইম্পির্ট্যান্টলি একটা মিউট বাটন থাকতে হবে, আমি বেশি কথা বলতে পারবো না, ফোনে তো নয়ই, আমি অনেক ব্যস্ত থাকি, সুতরাং কাজের সময় আমাকে যন্ত্রণা করা যাবে না। এইরকম কাওকে পেলে জানা। এখন বিদায় হ।’

আমি চলে আসলাম সেদিন। তারপর অনেকদিন তার সাথে দেখা হয় না, আমি জানি না, সে তার লুজলি কাপলড বিয়ে করতে পেরেছিল কিনা জানি না। একদিন হঠাৎ করেই গেলাম দেখা করতে, শুনেছি কিছুদিন হলো ও বিয়ে করেছে। প্রথমেই তার ল্যাব এ গেলাম, আমি জানি, তাকে এইখানেই পাওয়া যাবে।

কিন্তু এবার গিয়ে অবাক হলাম। তার ল্যাব এর বাকি দুইটা কম্পিউটার সুইচড-অফ। একটি অন করা কিন্তু তাতে স্ক্রিন সেভার চলছে। পাশে এক-কাপ চা, সেটি বোধহয় দু-এক চুমুক  দেওয়া হয়েছিল। রুমের অবস্থা আগের মতো নেই, বরং বেশ পরিপাটি।

পাশের রুমের দরজাটি লাগানো।

ছোট গল্প : নীল ও নীলিমা

ছোট গল্প : নীল ও নীলিমা

আকাশের অবস্থা সূচনীয়। এখনি ঝুম বৃষ্টি হবে। কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে এবং ঘন ঘন বিদ্যুত চমকাচ্ছে। নীলু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। উত্তরের জানালা। সামনে একটা কাঠাল গাছ। একটা পাখি বসে ছিল একটি ডালে। সেটি উড়ে গেল। কয়েকটা পাতা নড়ে উঠল অমনি। নীলু পাতা নড়ে উঠা দেখল। মনটা আচানক আকাশের মেঘের মতো কালো হয়ে গেছে। আজ সারাদিন ভালই ছিল। এই বিকেলে হঠাৎ করে একরাশ ভারি মেঘ মনের উপর দিয়ে বয়ে যেতে শুরু করলো। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। প্রকৃতির সাথে মানুষের মনের বেশ সাদৃশ্য। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি নামবে। ঝড়ও হতে পারে। ঝড়ের পর, প্রকৃতি খুব স্নিগ্ধ হয়ে উঠে। খুব শান্ত হয়ে যায় চারপাশ। খুব ভাল লাগে তখন। মানুষের মনের মাঝেও এই ব্যপারটি ঘটে। নীলু দেখেছে তার যখন খুব কষ্ট লাগে, কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করলে পরে বেশ ভাল লাগে। নীলুর গায়ে একটা বৃষ্টি ফোটা পড়ল। বেশ বড়। অমনি ঝম ঝম করে বৃষ্টি পরতে শুরু করল। ওর খুব ইচ্ছে করছে, বৃষ্টিতে ভিজতে। কিন্তু তা করা যাবে না। নীলুর ঠাণ্ডার সমস্যা আছে। বৃষ্টিতে ভিজলেই নিওমোনিয়া লেগে যাবে। সর্দিকে নীলু খুব ভয় করে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই সমস্যাটা তার প্রায়ই হয়। তার জীবনটাই এরকম। যত অপছন্দের ব্যপারগুলো আছে, সেগুলো মুখোমুখি হয় বেশি। জানালাটা বন্ধ করে দিল। ঘর অন্ধকার হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে থাকা যাক। বৃষ্টির শব্দটা অনেক মজার। কিন্তু এই ঘর থেকে তেমন কিছু বুঝা যাচ্ছে না। পাকা বাড়ির সুবিধা গুলোর চেয়ে এই অসুবিধা নীলুকে বেশি খারাপ লাগায়। বর্ষাকালের সৌন্দর্যই হচ্ছে টিনের চালের ঝম ঝম বৃষ্টির শব্দ। সব ঋতুরই কিছু সৌন্দর্য আছে। বসন্ত কালের সৌন্দর্য হচ্ছে, কাঠফাটা রোদে হেটে এসে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া। নীলুর মাঝে মাঝে অন্ধকারকে ভাল লাগে। মানুষের সাথে অন্ধকারের বেশ সম্পর্ক আছে। এই যেমন মানুষ জন্মের পূর্বে থাকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। আবার অন্তিম কালেও অন্ধকারের উদ্দেশ্যে যাত্রা। বাইরে এখনো আধার হয়নি। ওর জানালায় একটা ফুটো আছে। নীলু উঠে গিয়ে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিল, যাতে ফুটো টা দেখা যায়। তারপর বিছানায় বসে পড়ল। তাকিয়ে রইল ঐ ফুটোটার দিকে। এই তাকানোর কোন অর্থ নেই। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ফুটো দিয়ে দেখা যাচ্ছে। পুরো ঘর অন্ধকার। ফুটো দিয়ে একখণ্ড আলো কেমন করে যেন নীলুর বুকের কাঁপনি থামিয়ে দিল। ভাবনা গুলো আজ বেড়াতে আসেনি। খোলা মাঠ, ফাকা মাথা, সবুজ ঘাসের ত্বকে শিশির পরেনি এখনো। এক ধরণের আলুনী, মনের মাঠে ঠাণ্ডা হাওয়ার খিল নেই। মনটা যেন কেমন করে থেমে আছে। কোথাও আজ যেতে চাইছে না। ঘোড়াতো ছুটেই বেড়ায়, কারণে একারণে। মানুষের মনটা ঘোড়ার মতো। সারক্ষণ ছটফট করে বেড়ায়। আজ কারণ অকারণ কোনটায় ঘটছে না। নীলুর মনে হচ্ছে এই ফুটোটার দিকে তাকিয়ে অনন্তকাল পার করা সম্ভব। তার সময় যেন থেমে আছে। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, সময় আসলে ছুটে না। আমরা ছুটি। সময়কে পেছনে ফেলে ছুটি সামনের দিকে। সময় হচ্ছে একটা ট্রেন লাইন। আমরা সবাই ট্রেনেরে যাত্রী। একেক জনের স্টেশন একেক যায়গায়। নীলুর মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে হয়, তার স্টেশন কোথায়। সে কি থেমে আছে। যে কেন জানে না, কোথায় তার স্টেশন।

নীলুর কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করছে। অন্ধকারে কিছু লেখা যায় না। মোমবাতিটি জ্বালাল। মোমের আলোর অন্যরকম রঙ। ওর খুব ইচ্ছে হচ্ছে এই মোম শিখার হালকা প্রলেপটা গায়ে মাখতে। ও মাঝে মাঝে চিন্তা করে, গহীন কোন বনের মাঝে, মোমবাতির রঙের শাড়ি পর হারিয়ে যেতে। জোনাকী পোকার মালা গলায় দিয়ে কোন রুপালী রাতে ষরিষা ক্ষেতে দৌড়ে যেতে। কিন্তু এই ইচ্ছে গুলো সব সময় অপূর্ণ থেকে যায়। ওর ডায়রীটা বের করল, তারপর লিখতে শুরু করল,

“নিলয়, আমার ভালবাসার দ্বৈতসত্বার এক প্রহসণ। তাকে ক্ষ্যাপার পরশপাথরের মতই খুজেঁ ফিরি। যে হবে হরিণের চেয়ে চঞ্চল, মরিচিকার চেয়ে মায়াবী, আবার আকাশের চেয়ে বিশাল, বৃষ্টির মতোই নির্ঝর, যার বাস শুধু আমার ভিতরে, আমার অস্তিত্বে। কিন্তু ওর বাস এখন দুটি মানুষের ভেতরে। আমি এক করে আনতে পারবো না তাকে। একজনকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে অনূভব করেছি। আমার নিলয়ের কাছে শারীরিক ভালবাসা কিছুমাত্র। তাই হয়তো অপূর্ণতার খোব রেখে দিয়েছি কোথাও। মানুষ চায় পরিতৃপ্তি, আমার নিলয় তা চায়না। তাই সে শুধুই মানুষ,নিলয় নয়। আরেকজনের কাছ থেকে সেই কৈশোর থেকে নিলয় বেড়ে উঠার চেষ্টা করছে। কিন্ত ধীর কঠিন স্থির বাস্তবতার সাথে নিলয় পেরে উঠছে না। সে ছটফট করছে। একে হৃদয় দিয়ে অনুভবে আনতে পারি নি। তাই তার শরীর থেকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনতে চেয়েছিলাম আমার নীলময় ভালবাসা। নিলয়কে। কিন্তু সেখানে পেলাম শুধুই আবেদন। অবাক হলাম, সেখানে নিলয় থেকেও নেই।

শুধু দূর থেকে মাঝে মাঝে বুঝতে পারি ঐখানে আছে। হঠাৎ যেমন করে থাকে, তেমন হঠাৎ সে উধাও হয়ে যায় আমার একাকী কল্পনার দিগন্ত রেখার ধূলোময় মেঠো পথ ধরে আলোর কাছাকাছি। তাকে ছোয়া অসম্ভব। নীল আজ থেকে তুমি শুধু আমার ভেতরে থাকবে। আমাদের কল্পনার জগতে সাজবেলায় আমি তোমার বধু হবো।তোমার অস্তিত্ব শুধু আমাতে বিলীন হবে। কেও দেখবেনা আমাদের কল্পনাময় নীল ভালবাসাকে। তুমি আমার নীলয়। তুমি কারো ভিতরে থাকতে পারো না। তোমার অস্তিত্ব অদর্শণীয়। কেবল মাত্র অনুভূতিতে তোমার বাস। তোমাকে বৃথায় খুজি। তোমার পরিপূর্ণতা শুধু আমিই দিতে পারি। আজ তাই আমি দ্বৈত সত্বা, নিলয় ও নীলিমা।”

নীলু এইটুকু লিখে থেমে পরল। তারপর কিছুক্ষণ মোমবাতির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটানে ডায়েরী থেকে পাতাটি ছিড়ে ফেলল, এবং মোমবাতির আগুনে ধীরে ধীরে পাতাটি পুরে ফেলল।