আত্নশুদ্ধির পথে আত্ম উপলব্ধি

আমার মনে হয়, প্রত্যেকের ই দিনে একবার নিজেয়ে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে প্রশ্ন করা উচিৎ সে আসলে কে, নিজের পরিচয় জানাটা খুব জরুরী। নিজের মূল টাও জানা জরুরী। আমি কোথা থেকে এসেছি, এইটা জানতে পারলে আমি কোথায় যেতে চাই এই প্রশ্নের উত্তর সহজ হয়ে যায়।

আমি আমাদের এই উপমহাদেশের মানুষগুলো কিভাবে আসলো তা নিয়ে একটু পড়াশোনা করতে চাই, জানতে চাই, কিভাবে আমরা এলাম। অনেক জ্ঞানীগুণীরা শুরুতে বলে গেছেন, নিজেকে জানাটা অনেক বেশি জরুরী। নিজ কথাটা অনেক সময় ব্যক্তি নিজ না বুঝিয়ে সামগ্রিকও বুঝায়, মানে সামগ্রিক ভাবে আমরা। আমরা কোথা থেকে এলাম।

আমি ইতিহাসবেত্তা হবো না জানি, হওয়ার দরকারও নেই আমার, কিন্তু তবুও জানতে ইচ্ছে করে, কিভাবে কি হলো, অতীতের পরিক্রমা থেকে হয়তো সামনের পথ দেখা সম্ভব হবে না আমাদের এই সময়ে কারণ, এই সময়ের পরিবর্তন গুলো খুব দ্রুত হয়। কিন্তু অতীতের পরিবর্তন গুলো হতো খুব ধীরে, তিনশত বছর আগে এবং দুইশত বছর আগের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য দেখা যাবে না, কিন্তু এখন দশ বছর ব্যবধানের মাঝে বিশাল পার্থক্য ধরা পরবে।

এইযে আমি এখন বাংলায় লিখছি, এই বাংলা গদ্যরীতি শুরু করেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর বাবু না করলে জিনিসটা কেমন হতো? চিন্তা করলেই আজিব লাগে, আমি বসে বসে এখন হয়তো কবিতা লিখতাম, পদ্যে পদ্যে আমার মনের ভাব প্রকাশ করতাম। যাহোক, ঈশ্বরচন্দ্র সেই সময়ের একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি, তিনি আমাদের এই বাংলাকে অনেকদূর এগিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আমাদের কবি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে মজার কথা বলি, উনি কিন্তু কখনোই মনের মধ্যে ইচ্ছে পোষণ করেনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে লিখবেন। তার খুব ইচ্ছে ছিল ইংরেজি সাহিত্য সুনাম অর্জন করবেন, কিন্তু ইংরেজরা তা হতে দেন নি, ইংরেজরা নিজেদের নিয়ে বেশি সচেতন, কখনোই নিজেদের কর্তৃত্ব অন্যের হাতে দিতে চাইনি, এইটা আসলে এক অর্থে জাতীস্বচেতনা। আমারাই শুধু খুব বেশি সচেতন না। নিজেদের নিয়ে না ভেবে আমরা বেশি নিজেকে নিয়ে ভাবি, বলেই হয়তো আমরা এখনো আমরা। সব কিছু সামগ্রিক ভাবে হয়, একা কিছু করা সম্ভব না। আমি মাঝে মাঝে একটা উদাহরণ দেই, মানুষের মাঝে এক ধরণের আত্মবিধ্বংসি প্রবণতা আছে, মাঝে মাঝে আমরা নিজেদের ধ্বংস করে ফেলি। যেমন আমরা মানব জাতি, সুতরাং সমগ্র মানুষই আসলে আমরা নিজেরা, একটিকে ধ্বংস করা মানে, নিজেদেরই করা।

যাহোক, মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন ব্যর্থ কবি, তার কিছু করার রইলো না, তখন কেবল বাংলা সাহিত্যের গদ্য নিয়ে অনেকেই ভাবছেন, কিছু গল্প এবং নাটক লেখা হয়েছে, তো মাইকেল একদিন এগুলোর একটি দেখে নাক ছিটিয়েছিলেন। কি সব লিখে এইগুলা, তখন কে জানি ফূরণকেটেছিল, ইংরেজি সাহিত্যে কিছু করতে না পেরে এখন আসছে বাংলা সাহিত্যের সমালোচনা করতে, এইরকম, আমার সবটুকু মনে নেই, যাহোক, এইটা মাইকেল এর খুব লেগেছিল, তারপর থেকেই কিন্তু তিনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে উঠে পরে লেগে গেলেন। মাইকেল এর কবিতা আমরা সবাই পড়েছি, বিশেষ করে, আমার কপোতাক্ষ নদ সনেট টা মুখস্থ ছিল,

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে |

সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে ;

সতত ( যেমতি লোক নিশার স্বপনে

শোনে মায়া-যন্ত্রধ্বনি ) তব কলকলে

জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!—

বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?

দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি-স্তনে!

আর কি হে হবে দেখা?—যত দিন যাবে,

প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে

বারি-রূপ কর তুমি ; এ মিনতি, গাবে

বঙ্গজ-জনের কানে, সখে, সখা-রীতে

নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে

লইছে যে তব নাম বঙ্গের সঙ্গীতে!

যাহোক, আচ্ছা আমরা মনে হয় সবাই নীলদর্পন নাটকটি কথা জানি। এই নাটকটি কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্তই বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। মাইকেল এর একটা কথা আমার ভাল লাগে, সেটি হলো, আমি ব্যক্তিগত ভাবে কি করছি, সেটি যদি তোমার ক্ষতির কারণ না হয়ে দাড়ায়, তাহলে সেটি নিয়ে মাথা-ঘামিও না, বরং তোমাদের জন্য আমি কি করতে পারি, সেটা নিয়ে সমালোচনা করো। আমি এই জিনিসটা পছন্দ করি, পত্যেকেরই ব্যক্তিগত জীবন থাকে। একজন সেলিব্রেটির ও ব্যক্তিগত জীবন থাকে, সে আমাদের সবার জন্য কি করছে, আমরা বরং সেটি নিয়ে কথা বলি, তার নিজের জীবনটাকে নিয়ে কেন টানা হ্যাচড়া করবো? কিন্তু আমরা করি। খুব খারাপ একটা কাজ করি।

আমরা আজকের এই বাঙলী জাতির পেছনে বেশ কিছু লোকের অবাদান আছে, ঈশ্বরচন্দ্রের কথা বলেছি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের অনেকগুলো পথ খুলে দিয়ে গেছেন। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ বন্ধ করেছেন। আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বাংলাসাহিত্যের সাম্রাজ্য তৈরি করে দিয়ে গেছেন। আমার মনে হয়, বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্র নজরুল এবং জীবনানন্দ দাশ এই তিনজন যা দিয়ে গেছেন, আর কেও না থাকলেও সমস্যা ছিল না।

মাঝে মাঝে খুব অবাক হই, আমাদের তখনকার সময়গুলো কেমন অদ্ভুতই ছিল। মোঘলদের শাসন ছিল বৈচিত্র্যময়, আর ইংরেজদের শাসন ছিল পুরোটাই শোষনের। এদেশে তারা এসেছিল ব্যবসা করতে, ব্যবসা করতে এসে শোষণ শুরু করে। সেই ইতিহাস গুলো আসলে আমাদের জানা প্রয়োজন। আমরা হয়তো ইংরেজদের বিরুদ্ধে এখন প্রতিশোধ নিতে যাবো না,কিন্তু নতুন করে যাতে আবার শোষিত না হই, তাই জানা অনেক জরুরী।

একটি মজার তথ্য দেই, সেটি হলো মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতটি কিন্তু আবিষ্কার করেন রাধানাথ শিকদার নামে একজন বাঙালী গণিতবিদ।

নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা বইটা আমি অনেক ছোট বেলায় পড়ে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝে খুব অবাক হয়ে ভাবি, আমাদের এই উপমহাদেশ যারায় শাসন করেছেন, তাদের আসলে দেশের জনসাধারণদের নিয়ে কোন ভাবনা ছিল না। তারা নিজেদের খেয়াল খুশি মতো চলতেন, আর শোষণ করে যেতেন। দেশের সাধারণ জনগন না খেয়ে কষ্টে ভোগে মারা যেতেন, কিংবা শোষিত হতেই থাকতেন, এবং কোন একসময় ভুলেই যেতেন, তারও একটা জীবনবোধ আছে, মেনেই নিতেন এইটা নিয়তি। আমার মনে হয়, এখনো সেই শাসনের চিত্র পরিবর্তন হয় নি, এখনো আমাদের শাসকরা তাদের খেয়াল খুশি মতো চলেন, সাধারণদের কথা কখনো ভাবেন না। প্রতি পাঁচবছর পরপর একটা নাটক মঞ্চায়িত হয়, শাশক পরিবর্তনের,আমরা সাধারণরা সেটা আনন্দের সাথে দেখি, আমরা ধরেই নিয়েছি, এইটাই নিয়তি। কি অদ্ভুত।

দেশপ্রেম একটা অদ্ভুত ব্যাপার। দেশের প্রতি মায়া থাকাটা সত্যিই অদ্ভুত, দেশের জন্য নিজেকে আমাদের দেশে উৎসর্গ করেছে, তার উদাহরণ এতো এতো বেশি যে খাতায় লিখে রাখা সম্ভব হয়নি সব, কিন্তু কেন করেছেন তারা? কঠিন প্রশ্ন। একটা দেশ আসলে কি, একটা ভূ-খণ্ড আর দেশের মানুষ মিলেই তো একটা দেশ। মানুষ না থাকলে আসলে ভূ-খণ্ডের দরকার নেই। যেহেতু নেই, সুতরাং মানুষ আসলে দেশের মূল ব্যাপার। সুতরাং দেশ প্রেম আসলে তার আশে পাশের মানুষ গুলোকেই ভালবাসা।

যাহোক, নিজেকে জানার জন্য আসলে নিজের মূলটাও জানতে হবে, নিজের চারপাশটা জানতে হবে, আমি কি করতে চাই, তা ঠিক করতে হলে, আগে জানতে হবে আমি আসলে কে, কোথা থেকে এলাম। আমি যখন জানি কোথা থেকে এলাম সেটা জানা হয়ে গেলে জেনে যাবো আমি আসলে কোথায় যেতে চাই, শুধু মাত্র খেয়ে দেয়ে বেচে থাকার মধ্যে আসলে জীবনের সার্থকতা নেই, বরং সবাই মিলে আমার চারপাশের মানুষদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাঝে অনেক শান্তি, জীবনটা অনেক আনন্দের হয়।

Pena Capital

মৃত্যু একটি ভয়ংকর ব্যাপার। মানুষ কখনো মরতে চায় না। সবারই বেচে থাকার আকুতি থাকে শেষ পর্যন্ত। যতই প্রলোভনই দেখানো হোক না কেন, মানুষ এই পৃথিবীর মাঝেই থাকতে চায়। মৃত্যুকে উপেক্ষা করার চেষ্টা মানুষ সেই প্রথম থেকেই করে আসছে, যদিও মানুষের মধ্যে একটা আত্মবিধ্বংশী প্রবণতা আছে, এই প্রবণতাটি অনেক সময় একক ভাবে নিজেকে না বুঝিয়ে নিজেদেরকে বুঝায়। আমরা অনেক সময় নিজেদেরকে ধ্বংস করে ফেলি। আমরা মানুষ, সমগ্র মানব জাতি মিলেই তো আমরা  একটা প্রজাতি, আমরা কেও আলাদা না। আমরা যখন একজন অন্যজনকে হত্যা করি, এতে তো আসলে আমরা নিজেদেরকেই হত্যা করি। আমার মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে দেখে আমরা কিভাবে নিজেদেরকে নিজেরাই ধ্বংস করে ফেলছি। পৃথিবীতে আমরা একসময় আমি থাকবো না, এইটা স্বাভাবিক, প্রকৃতির একটি নিজস্ব গারবেজ কালেক্টর আছে, অবজেক্ট এর লাইফটাইম শেষ হয়ে গেলে তাকে ধুয়ে মুছে ফেলতে হয়, এর থেকে আমরা হয়তবা বের হতে পারবো না, কিন্তু আমাদের লাইফ টাইম যতক্ষণ থাকবে,ততক্ষণ আমরা কেন নিজেরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখবো না? মানুষ হত্যা প্রক্রিয়াটি কতনা নিষ্ঠর এবং কুৎসিত। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের পৃথিবীতে মৃত্যুদণ্ড নামক কুৎসিত ব্যাপারটি এখনো কিভাবে আছে, আমরা অনেক সভ্য হয়েছি, দিনকে দিন হচ্ছি তবুও কেন আমাদের অতীতের ভুল গুলো মুছে ফেলতে পারিনি। ভয়ংকর অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডও আমার কাছে খারাপ লাগে। আমি জিনিসটা মেনে নিতে পারিনা, শাস্তি হিসেবে কেন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, আর কোন কি পথ নেই। অপরাধীর শাস্তি নিয়ে আমার মনে মাঝে মাঝেই কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়, এগুলো উত্তর ঠিক আমার জানা নেই, কিন্তু প্রশ্ন গুলো মাঝে মাঝেই মনের মধ্যে ধূলিঝড় তৈরি করে। মনে করা যাক, একটি মানুষ, সে ভয়ঙ্কর রকম কোন অপরাধ করে বসেছে, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। মানুষটি একটি ফ্যামিলি আছে, তাতে তার ছেলে মেয়ে আছে, বাবা মা আছে। যে মানুষটি অপরাধ করেছে সে শাস্তি পাক, আমার কোনই আপত্তি নেই। আমার আপত্তি হলো, এই লোকটিকে শাস্তি দিতে গিয়ে কিন্তু অন্যদের শাস্তি দেওয়াটি কি ঠিক হবে, মানুষটির ছেলে মেয়ে কেন তাকে হারাবে, তার আত্মীয় স্বজনকে কেন তার অপরাধের জন্য কষ্ট পাবে? এইভাবে হয়তবা কি কেও চিন্তা করে নি ? এর চেয়ে কি ভাল কোন উপায় নেই? আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করি, আজ বিজ্ঞান আজ অনেক উন্নত হয়েছে, হচ্ছে, মানুষ সিংগুলারিটির দিকে ধাবিত হচ্ছে, মানুষ জরার মূল কারণ বের করে ফেলেছে (টেলোমারস নামক কণিকা, এরা ডিএনএ’র এক অংশ, যখনই জৈব কোষ ভাঙে, এই কণিকগুচ্ছের দৈর্ঘ্য ছোট হতে থাকে, তখন ছোট হতে হতে শেষ হয়ে যায়, তখনই শুরু হয় জরা) এখন কেন আমরা সেই আদিম ভুল গুলো থেকে বের হয়ে আসতে পারবো না।
আমি মাঝে মাঝে চিন্তুা করি, মানুষের মস্তিষ্ক থেকে অপরাধের স্মৃতি গুলোকে সরিয়ে দিতে পারলে কেমন হতো, কিংবা এমন কোন প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকটি মানুষকে নিয়ে আসা হতো, যাতে করে তারা কখনোই অপরাধ নামক বস্তুটির সংস্পর্শে আসতে না পারে।

মানুষ যেভাবে সিদ্ধান্ত নেয়

মানুষ সাধারণত দুই ভাবে সিন্ধান্ত নেয়, এক, চিন্তা ভাবনা করে বুদ্ধি খাটিয়ে মস্তিষ্কের কিছুটা ব্যায়াম করিয়ে, অন্যটি হলো, পুরোপুরি মনকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থাৎ মন যা চায়, তাই করে ফেলা। দুটো জিনিস দুই রকম, দুইটার ফলাফল সাধারণত এক হয় না। মন অনেক ক্ষেত্রেই ভুল কিংবা হঠকারি সিন্ধান্ত দিয়ে বসে। তবে এটি সত্যি যে, মাথা খাটিয়ে চিন্তা করে সিন্ধান্ত নিলেই যে সিন্ধান্তটি সঠিক হবে তা নয়, মাঝে মাঝে দুটিই ভুল হতে পারে। ভুল সাধরণত হতেই পারে, সুতরাং এক্ষেত্রে কিছু করার নেই। তুমি একটা ভুল করে ফেলতেই পারো, এবং যা তোমার বিশাল ক্ষতির কারণ হতে পারে, কিন্তু তুমি যদি এভাবে ভাবো, এই ভুলটা করেছি, বেশ ভাল হয়েছে, এই  ভুলটা আমি দ্বিতীয়বার করবো না, এটি ছিল আমার একটি ভাল এডুকেশান। আর মানুষ মাত্রই দু-একবার ভুল করে বসবে, তাহলে জিনিসটি সহজ হয়ে যায়। তবুও আমাদের সবসময় উদ্দেশ্য থাকে যাতে করে আমরা ভুল সিন্ধান্ত না নেই। এখন তুমি যদি অগ্র পশ্চাৎ চিন্তা করে কোন সিন্ধান্ত নাও, তাহলে যা হবে সিন্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াটা একটু ধীর হবে, কিন্তু সিন্ধান্তটি মোটামুটি সিকিউর হবে, ভুল হওয়ার সম্ভবনা কম থাকবে। কিভাবে বলি, মনে করো, তুমি এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উঠো, তোমার কাছে অনেক অপশান থাকে, মনে করো, তুমি যদি এস.এস.সি তে পড়বে, তোমার হাতে তিনটা অপশান থাকে, সায়েন্স, আর্টস, কিংবা কমার্স। তুমি ভার্টিক্যালি মুভ করতে পারো। এভাবে এইচ.এস.সি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আরো বেশি অফশান থাকে। এভাবে এগুতে এগুতে তুমি একটা পর্যায়ে এগিয়ে যাও। এটি মোটুমুটি মোস্ট সিকিউরড প্রসেস, একটাতে ফেইল করলে তুমি অন্যটি বাছায় করতে পারো। কিন্তু তুমি একেবারে সব কিছু হারিয়ে বসবে না। কিন্তু তুমি যদি মনে করে থাকো, আমি এখনি জানি, তুমি অদূর ভবিষ্যতে কি হবে, তাহলে তুমি এই প্রসেস গুলোকে এভোয়েড করতে পারো, যেমন বিলগেটস, কিংবা স্টিভ জবস। কিন্তু এগুলোতে একটা রিস্ক ফ্যাকটর আছে। বিলগেটস কিংবা স্টিভ জবস আজেকের অবস্থানে নাও আসতে পারত। সেই সম্ভবনা কিন্তু কম ছিল না।

চিঠি

আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার আবার আগের মতো চিঠি লেখার অভ্যাসটা শুরু করা উচিৎ। চিঠি লেখা অন্যরকম একটা ব্যপার। এই অন্যরকম ব্যপারটা অনেক মজারও। মানুষের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার থাকে, এর মধ্যে চিঠি লেখা ব্যপারটি খুব কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটা চিঠির মধ্যে মানুষ তার নিজেকে লিখে ফেলতে পারে, নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করে ফেলতে পারে, যা হয়তো অন্যকোন ভাবে খুব বেশি সম্ভব নয়। আমি আগে প্রচুর চিঠি লিখতাম। যেকোন একজনকে উদ্দেশ্য করে লিখে ফেলতাম। সেগুলো অবশ্য কখনো তাদের কে দেওয়া হতো না। শুধু শুধু লিখে ফেলতাম, যখন ইচ্ছে হতো। এখন সময় হয় না, এই কথা বললে ভুল হবে, সময় সমসময় বের করে নেওয়া যায়, কিন্তু সেই ইচ্ছা গুলো অন্যরকম হয়ে গেছে।

পত্যেকটা মানুষই হয়তো বদলে যায়। কিন্তু এই কথাটা আমি অন্যরকম ভাবে বলি, মানুষ ঠিক বদলায় না, সময়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম আচরণ করে। প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্বতা থাকে, এইটা তার একান্তুই নিজের এবং তা তারই থাকে, সে ইচ্ছা করলও সেটি মুছে ফেলতে পারে না, চেষ্টা করলেও সেটি মুছে ফেলা যায় না।

শরতের মেঘ

মাঝে মাঝে ভাবি আমি বুঝি শরতের মেঘ। ভেসে বেড়ানোই আমার গন্তব্য। এখান থেকে ওখানে, অথচ আমার গন্তব্য এখনো নির্ধারিত হয়নি। এখনি হয়তো মেঘ হয়ে ঝড়ে পরবো এমন একটি ভাবনা মাথায় রেখে উড়ে যাওয়া। মাথার ভেতর অনেক ভাবনা ধোয়ার মতো চোখ বুজে ঘুমিয়ে থাকে, মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে চোখ মেলে তাকায়, নতুন ভাবনার জন্মদেয়, এইভাবেই কেটে যাচ্ছে সময়। সময়, হাওয়ার মতোই উড়ে যায়। মাঝে মাঝে সময়কে থামিয়ে রেখে দেখতে ইচ্ছে হয়, কেমন হয় ব্যপারটা।

আমার ভাবনা গুলো

একটা সময় আসে যখন সবকিছু কেমন করে আপনা আপনি বদলাতে শুরু করে। এই বদলটা হয়তো খানিকটা বাহ্যিক, খানিকটা মানুষিক। বাহ্যিক হয়তো সামান্য, তবে মানুষিকটা জটিল। সবকিছু তো আগের মতোই থাকে, সূর্য তো পশ্চিমেই উঠে, ভুল-ভাল হয় না। তাই হয়তো বাহ্যিক পরিবর্তনটা খুব বেশি পরিমেয় নয়। যাহোক, মানুষিক পরিবর্তনের সাথে সাথে হয়তো দৃষ্টি-ভঙ্গিটারও পরিবর্তন হয়। দেখার প্রার্থক্য ঘটে। একই চোখে এক বছর আগে যা দেখেছি, এখন অন্য কিছু দেখি। ধীরে ধীরে আমাদের জ্ঞান-গরিমা বাড়ে, আমরা প্র্যাকটিক্যাল, রেশনাল হওয়ার চেষ্টা করি। প্রত্যেক কাজে অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা করি। ইমোনশানকে পাত্তা দিতে কম চেষ্টা করি। সবকিছুতে প্রাকটিকাল সলুউশান আশা করি। এটা বেশ ভাল। তবে আমরা মানুষ বলেই কোন না কোন ভাবে ইমোশানের মাঝে আটকা পরে থাকি। যতই রেশনাল হওয়ার চেষ্টা করি না কেন, একসময়, কোন এক মুহূর্তে আমরা আবেগটাকে প্রাধান্য দিয়ে ফেলি। এই বিশেষ মুহূর্তটা এতো বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, ঐ কাজটা না করলে ফলাফল অন্যরকম হতো। এটাকে কেওস থিওরীর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রত্যেকটা ইভেন্ট এর ইম্পেক্ট থাকে। ফড়িং ডানা না ঝাপটালে হয়তো ঝড় হতো না। ধরে নেওয়া যায় সেরকম একটা ব্যাপার। ব্যাপারটা সত্যি হলেও ফড়িং কিন্তু ডানা ঝাপটানো বন্ধ করবে না। এমনকি আমরা সব ফড়িং মেরে ফেলবো না। যাহোক, মানুষের চিন্তা ভাবনার একটা গণ্ডি থাকে। এর বাইরে সে ভাবতে পারেনা। যেমনটা, কেও যদি কোন খাবার পূর্বে  কখনো না খায়, তাহলে সেই খাবারের স্বাধ কল্পনা করতে পারবে না।

আমি অনেক ভাবি। এক ভাবনার পরতে অন্য ভাবনা চলে আসে। তারপর ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বট গাছ হয়ে যায়। অদ্ভুত লাগে তখন। একসময় মানুষের কর্মকাণ্ড গুলোকে খুব খেয়ালী মনে হয়। কিছুটা ভাল লাগা আর কিচুটা অবেলার ক্লান্তি মিশে একাকার হয়ে যায়। মনের মধ্যে অদ্ভুত রিনরিন ভাব ঝেকে বসে, তখন শুধু ভাবতেই ইচ্ছে করে। সেই ভাবনা থেকে মন উঠে আসতে চায় না। কিন্তু ভাবনার চ্ছেদ এক সময় পরেই। ঐ যে বললাম, আমরা এখন রেশনাল, প্র্যাকটিক্যাল হওয়ার চেষ্টা করি। এবং স্বাভাবিকভাবেই  দৈনন্দিন নিজস্ব কাজ কর্মে আত্মমগ্ন হতে হয় আবার। ভাব আবেগ গুলো ঠায় হয়তো সেখানে খুব কম। আমি মাঝে অবাক বিষ্ময়ে ভাবি আর প্রত্যেকটা কাজ কর্মের সঠিক ব্যাখ্যা বের করতে চেষ্টা করি। কেন আমাদের এতো কোলাহল। কেন আমরা বেঁচে থাকা তাগিদ অনুভব করি। এই কথা গুলো হয়তো অপটিমিস্টিক নয়, তবুও মাঝে মাঝে আমাকে বড় আগলা করে দেয়। কেনই বা এতো ইচ্ছা অনিচ্ছার ভেড়াজ্বালে আমাদের প্রাত্যহিক দিনাতিপাত। এ থেকে বের হওয়ার আদৌ কোন পথ আছে কি? তখনি নানা রকম ভাবনা ঝেকে বসে। মনটা বড়ো পৃথুলা হয়ে যায়। নিজেকে বড় বুড়ো বুড়ো মনে হয়। অথচ কিইবা আমি। এইতো আমার কেবল শুরু। আর কতশত সময়ের স্রোতে অবগাহন করতে হবে । সময়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ জানি। কিন্তু মাঝে মাঝে এগুলোকে অবহেলা করতে বড় ভাল লাগে। এই ভাললাগাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে হয়তো বেশ বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যায়, কিন্তু কি করবো, পারি না। প্র্যাকটিক্যাল হওয়ার যতই চেষ্টা করি না কেন, মনের ভেতর কোথাও একটা শিশু বাস করে, আনমনে সে খেলে যায়। তার এই খেলার মানে নাই যদিও, কিন্তু তাতে তার মাথা ব্যাথা নেই, তার খেলা সামগ্রী, সাথী থাকলেই হলো।

অবেলায় লিখছি, আকাশে বিকেলের রোদ নেই, বরং বেশ গম্ভীর। সন্ধ্যার অনেক আগেই মনে হচ্ছে সান্ধ্য রচনা হবে। আর মেঘ গুলো নীলকে ছেয়ে ফেলছে। রাগী রাগী ভাব নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভাল লাগছে না কিছুই। মনটা বড়ো বাধো বাধো ঠেকছে। মাঝে মাঝেই মনে হয়, আমি কোথাও যেন আটকা পরে আছি একটা কিছুতে। সেই একটা কিছুকে ঘিরেই আমার যত সব আস্ফালন, ভাব রচনা। নিজেক বড়ো হতাশ মনে হয়। যত বেশি করে মন থেকে সরিয়ে ফেলতে চাই, তত বেশি করে মনের মধ্যে আরো ভাল করে আসন নিয়ে বসে। এখানেই আমার পরাজয়। ভাল লাগে না। নিজেকে নিজের কাছে অসহ্য মনে হয়। কেন এমন লাগে।  আমি কেন পারি না জয় করতে। একটা বৃত্তকে কেন্দ্র করে ঘুরছি, অথচ পারছিনা কেন্দ্রে পৌঁছতে, না পারছি বাধন ছিড়ে হারিয়ে যেতে।