অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড কনসেপ্ট এবং আমার আলসেমি

আমি লোকটা প্রচুর অলস। তার আগে বলে নেই, আমি একজন প্রোগ্রামার। তবে প্রোগ্রামার বললেই সবার মনে হয়, সি, পাইথন, হাসকেল কিংবা এসেম্বলিতে কোড লিখে, আজিব একটা বস্তু, চোখে বিশাল সাইজ চশমা পরে, অসামাজিক, ইনট্রোভার্ট এবং ফ্যাশনেবলি চ্যালেঞ্জড এবং প্রচণ্ড অলস কাওকে। তবে আমি এরকম না, আমি হচ্ছি অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামার। আমি জাভাতে কোড লিখি, এবং প্রত্যেকটা অবজেক্ট ইনট্যনসিয়েট করে করে ডট দিই। আমি আসলে ডট ছাড়া মোটামুটি অচল। সব কিছুর জন্য রেফারেন্স লাগে।

গল্পটা বলি, আমি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন থেকে টাকা তুলতে গেছি। সোনালী ব্যাংক এ ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন এর সাইনবোর্ড দেখেছি, সুতরাং এখান থেকে তুলা যাবে। গেলাম, কিন্তু ওনাদের সিস্টেমে সমস্যা। অন্য ব্যাংক এ রেফার করলো। গেলাম ব্র্যাক ব্যাংক এ। গিয়ে প্রথম ডেস্কে এ জিজ্ঞাসা করতেই  পাঠিয়ে দিল ৫ নাম্বার ডেস্কে। সেই ডেস্কে এক ভদ্রমহিলা (মহিলা বলা কি ঠিক হবে (???) ) বসে আছেন। তাকে গিয়ে বললাম আমি টাকা তুলতে চাই। ভদ্রমহিলা আমাকে একটা ফরম ধরিয়ে বললেন এইগুলা পূরণ করে দেন। কিন্তু ফরম এর এতোগুলা ঘর দেখে আমার মনে হলো, কি আশ্চর্য এতো গুলা জিনিস আমাকে পূরণ করতে হবে, যিনি আমাকে টাকা পাঠিয়েছেন, উনি তো আমাকে একটা কোড ছাড়া আর কিছু দেন নি। আমি চিন্তা করতে থাকলাম, আর উনি আমার ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের আইডি-কার্ড চাইলেন, আমি বললাম, আমার তো ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের আইডি কার্ড নেই, তখন তিনি আমার ভোটার আইডি কার্ড চাইলেন। আমি তাকে বললাম, আমার তো ভোটার আইডি কার্ড নেই। উনি চোখটা কপালে তুললেন। বললেন আপনার ভোটার আইডি কার্ড নেই, কি আশ্চর্য। আসলে নেই, কারণ আমি শুরুতেই বলেছি আমি অনেক অলস, আসলেও তাই। এই জন্য ভোটার আইডি কার্ড  নাই। তখন উনি বললেন আর কোন আইডি? আমি আমার ইউনিভার্সিটির আইডি দিলাম। উনি সেটা নেড়ে চেড়ে বলেলেন, এইটার তো মেয়াদ শেষ। মেয়াদ তো শেষ হবেই, আমি পড়ি চতুর্থ বর্ষে আইডি কার্ড হচ্ছে দ্বিতীয় বর্ষের। পরেরটা ইস্যুই করি নাই। কতো কষ্ট, হলের অফিসে যাও, তারপর গিয়ে দেখতে হবে, হলের অফিসে যিনি কার্ড দেয়ার হর্তাকর্তা, তার সময় সুযোগ, নাই বা তুললাম । সুতরাং উনি বললেন, আইডি কার্ড ছাড়া তো হবে না। আমি কি করি? উনি আবার জিজ্ঞাস করলেন, ব্র্যাক ব্যাংক এ আমার কোন কোন একাউন্ট আছে কিনা, আমি  বললাম না। অনেকক্ষণ পর মনে হলো হ্যাঁ আছে তো, আমার তো একটা ব্র্যাক ব্যাংক এ একটা একাউন্ট আছে, আমি না কেন করলাম। তারপর তাকে বললাম আমার তো একাউন্ট আছে, উনি আমাকে বললেন,একাউন্ট নাম্বার কত? আমি সুন্দর করে বললাম জানি না তো? উনি আবারও চোখ কপালে তুলে বললেন, আপনার একাউন্ট নাম্বার মনে নেই? তখন আমার মনে হলো, আমার তো একটা ভিসা কার্ড আছে, তাকে বললাম,তাকে আমার ভিসা কার্ড টা দিলাম। তখন উনি কষ্ট করে আমার কার্ডটা নিয়ে গিয়ে আমার একাউন্ট ইনফরমেশন এবং আইডি কার্ড প্রিন্ট করে নিয়ে আসলেন। আমি এর মধ্যে ফরমে আমার নাম এবং কোড টা লিখেছি। উনি এসে বললেন, বাকি গুলো কই? বাকি গুলো তো আমি জানি না। উনি চোখ আকাশে তুললেন যখন জানলেন, যে আমাকে টাকা পাঠিয়েছে তার নামটাও জানি না। উনি বেশ অবাক হয়েই বললেন, আপনাকে একজন টাকা পাঠিয়েছে আর আপনি তার নাম জানেন না। কিছুক্ষন হ্যাঙ হয়ে থেকে আমাকে প্রশ্ন করতেই থাকলেন। আমি বললাম জানি না। আমার আসলে মনে পরছিল না। সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন যখন দেখলেন আমার বর্তমান ঠিকানার জায়গাটাও খালি। আমি এখন নীলক্ষেত এ থাকি, কিন্তু এইখানের ঠিকানা জানি না। জানার দরকার মনে হয় নাই। তারপর আর কি উনি শুধু কোডটা নিয়ে কম্পিউটার থেকে বাকি সব ইনফরমেশন নিয়ে নিজেই ফিলআপ করলেন। তারপর আমার সিগনেচারটা দেখিয়ে বললেন, এইটার মতো করে এখানে এখানে সাইন করেন। উনি হয়তো ভাবছে আমি নিজের সাইনটাও ভুলে বসে আছি। তবে এর মাঝে একটা চরম ইনসাল্টিং কথা বলেছেন, সেটা না হয় নাইবা বললাম।

 

যাহোক, আমি শেষ পর্যন্ত টাকাটা তুলতে পারলাম। ভদ্রমহিলাকে একটা থ্যাংকস। কিন্তু উনি আসলে অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড কনসেপ্ট জানেন না। জানলে আমাকে এতো প্রশ্ন করতেন না। শুধু মাত্র আমার কোড টা নিলেই সব কিছু জানতে পারতেন।

আমি যে অলস তা নিয়ে আরেকটু বলি, সেটা হলো যে ভদ্রলোক আমাকে টাকা পাঠিয়েছেন, উনি আমাকে দুই সপ্তাহ থেকে মেইল করেই যাচ্ছেন যেন আমি যেন গিয়ে টাকাটা তুলি। উনি টাকা পাঠানোর তিন সপ্তাহ পর আমি টাকা তুলে আনলাম।

শেষে বলি তুমি যদি অলস না হও, তুমি আসলে খাটি প্রোগ্রামার হতে পারবে না।

Some people are by born Lucky, may be Im one of them

ঘড়িতে সারে নয়টা, আমি বাসে, আজিমপুর থেকে উঠেছি, আজমপুর নামব। আমার বন্ধু রাজু। তার এক রিলেটিভ এর বাড়িতে যাবো। রওনা দিতে দিতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

পাশের ভদ্রলোককে বার বার জিজ্ঞাসা করছি, লোকটি করডিয়াল, আমাকে বলল, আজমপুর এলে আমি বলবো, এর মাঝে কিছুক্ষণ ঘুমিয়েও

নিয়েছি। যাহোক একসময় বাস থেকে নামলাম।

এখন রিক্সা নিতে হবে। রাজুর  এই ডিরেকশান। রিক্সা দিয়ে দাদা গার্মেন্ট এ যেতে হবে। রিক্সায় উঠলাম, রিক্সাওয়ালা  কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বুঝলাম না। আস্তে আস্তে রাস্তার আলো কমে আসছে। কিছুক্ষণ পর পুরোপুরি অন্ধকার।

আন্টি(রাজুর আম্মু) কে ফোন দিলাম। কথা বলে শুনতেছিলাম দাদা গার্মেন্ট থেকে এর পর কোথায় যাবো। ঠিক তখনি মোবাইলটা অফ হয়ে গেল। চার্জ শেষ। কোন ভাবেই ওইটাকে স্টার্ট করতে পারলাম না।  এখন কি করি।

রিক্সা দাদা গার্মেন্ট এর সামনে এসে দাড়াল, তাকে বললাম আসে পাশে কোথাও ফোন ফ্যাক্স এর দোকান আছে কিনা।  সে বলল নেই, যেখান থেকে আমাকে তুলে এনেছে সেখানে ছাড়া।  এখন দুইটা উপায়, এক ব্যাকট্র্যাক করা অথবা একটা রিস্ক নেয়া। রিক্স নিলে ক্ষতির আসংখ্যা একটু বেশি, আমার সংগে লেপটপ, মোবাইল এবং কিছু টাকা। ল্যাপটপ খুয়া গেলে আমার তখন ঠিক বেচে থাকার ইচ্ছে টা চলে যাবে। কারণ এতে যা আছে তা তার হার্ডওয়ার যা দাম, তার চেয়ে কয়েকগুণ ভ্যালুয়েবল জিনিস আছে।  দাদা গার্মেন্ট এর সামনে দুজন দাড়োয়ান ছিল, তাদের কাছে নকেয়া মোবাইল সেট আসে কিনা জিজ্ঞাসা করলাম, নেতিবাচক উত্তর।  কি করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

রাজুর নাম্বার আমার মনে নাই, রাজু যে এড্রেস দিয়েছিল তা আমার মোবাইল ইনবক্সে। যার বাসায় যাচ্ছি তার নাম পর্যন্ত  জানি না।

একটা লোক এসে দাদা গার্মেন্টস এর সামনে এসে দাড়ালো। তাকে সেইম প্রশ্ন করলাম, নকিয়া মোবাইল আছে কিনা। থাকলে তার ব্যটারী ধার নেবো এইটা উদ্দেশ্য। কিন্তু আবারও নেচিবাচক উত্তর।

লোকটা যথেষ্ঠ দয়াবান, আমাকে তার ফোনটা দিয়ে দিল। আমি বললাম, আমি কি আমার সিমটা আপনার মোবাইল এ ইউস করতে পারবো কিনা। সিউর।

আমি সিম ভরলাম। কিন্তু অবস্থা খারাপ হলে অনেক কিছুই কাজ করে না। আমার সিম এ অনেক্ষণ চেষ্টা করেও নেটওয়ার্ক পেলাম না।  লোকটি এবার বলল, নাম্বারটি লিখে নিন, আমার মোবাইল দিয়ে ফোন করেন।

নাম্বার লিখে নিবো কোথায়। কাধব্যগে অনেক খোজাখুজির পর একটা পেন্সিল পেলাম। সেটা দিয়েই লিখলাম।

লোকটি তার মোবাইল এ তার সিম ভরলো, এবং রাজুর নাম্বারে ডায়াল করার পর বুঝতে পারলাম ডিজিট একটা কম লিখেছি। তারপর একটা লোপ চললো, যতক্ষণ পর্যন্ত  মোবাইল নাম্বার ঠিক না হবে মোবাইল খোলা এবং আমার নতুন করে ভরা।

শেষ পর্যন্ত রাজুকে পেলাম।  কিন্তু রাজু যেভাবে বলল, তা আমার বোধগম্য হলো না। কিছুই বুঝলাম না , কিভাবে কোথায় যাবো।  পাওযার নাই, কিছুই দেখছি না। তারপর আর কি, এই গ্র্যাট ম্যন আমাকে পথ দেখিয়ে পুরা আধঘন্টা আমার সাথে থেকে বাসা খুজে দিয়ে ফিরে গেল। আমি তাকে অনেক অনেক থ্যাংকস দিলাম।  তার নাম্বারটা রেখে দিলাম। লোকটি উত্তরা এগারতে একটা কলসেন্টারে জব করেন, বিডিয়ার এ ছিল । তার দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। বড়ে মেয়ে এইবার এসএসিতে এ+ পেয়েছে। ওনার নাম আক্তার হোসেন।

বাসায় এসে চিন্তা করলাম, কাজটা খুব বেশি কি রিস্কি হয়ে গিয়েছিল। ওনি যেসব গলি এবং শর্টকাট দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তাতে করে কোন একসময় যদি বলতো সবকিছু রেখে যেতে আমার কিন্তু করার কিছু ছিল না।

আইম রিয়েলি গ্রেটফুল টু হিম।

আজ সকালে তাকে ফোন দিয়ে আবার থ্যাংকস জানালাম।  উনি বলল, আর ভাই মানুষ মানুষের ই তো উপকারে আসে তাই না।

I’m feeling lucky  that I always meet with such great man. All the people around me, are really really  great.

স্বর্গের পথে কিছুক্ষণ…

শুক্রবার, আজ সকালটা ছিল সাধারণ অন্য সব সকালের মতোই। সকালের শুরুর দিকে আমার ঘুমানোর কথা ছিল, কিন্তু কেন জানি ঘুম এলো না। বসে বসে লেপটপ নিয়ে কাজ করতেছিলাম। রাতে ঘুমাইনি। সুতরাং একটু পরই আমি ঘুম সাগরে ঝাপিয়ে পরবো। কিন্তু শাওনের ফোন পেলাম এগারটার দিকে। লিণ্ডা আসবে। আমি বললাম, ইশ আমার তোদের সাথে থাকতে পারলে খুব ভাল লাগতো, কিন্তু আমি তো এখন ঘুমাবো। হুম। কি আর করা !আমি আমার কাজ করতেছি। আসলে তেমন কিছু করতেছি না। আমার ধারণা এই মাসে আমাকে মেসের মিল প্রিফেক্ট হতে হবে। বসে বসে হিসাব করার জন্য এক্সেল এ টেবিল তৈরি করলাম। যাতে ক্যালকুলেশান টা ডাইনামিক হয়। তারপর হঠাৎ মনে হলো, এইটা অনলাইন এ করলে কেমন হয়, শুধুমাত্র যাদের একসেস দেবো তারাই দেখতে পারবে। তাহলে কেও আমাকে আর জ্বালাবে না। যখন খুশি তারা তাদের স্ট্যাটাস দেখতে পারবে। হুম তাই করছিলাম। তখনি আবার শাওন ফোন দিল। লিণ্ডা টিএসসি তে আসছে এবং আমাকেও আসতে হবে। তো আর কি করা আসতে যখন হবেই, আসবো। বললাম আসতেছি। তো আমি আমার মতো কাজ করতেছি। ওরা টিএসসি এসে ফোন দিলে তারপর রওনা হবো। আমি আজিমপুর এ থাকি, সুতরাং খুব অল্প সময়ই লাগবে। একটার দিকে শাওন ফোন দিল, তাড়াতাড়ি আয়, আমরা চলে এসেছি, আর ফয়সাল ভাইয়াও আসবে। ফয়সাল ভাইয়া খুব ইন্টারেস্টিং একটা ক্যারেক্টার, শাওনের কাছে শুনেছি। সুতরাং তাকে দেখার খায়েস অনেকদিন থেকেই ছিল।

যাহোক, তারপর বাসা থেকে বের হয়ে টিএসতি এসে দেখি শাওন আর লিণ্ডা বসে আছে। ওদের সাথে জয়েন করলাম। বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। এর মধ্যে আমরা এটা সেটা কিনছি আর খাচ্ছি, গল্প করছি, আরও অনেক কিছু। কিন্তু এইভাবে বসে থাকতে আমার ভাল লাগে না। শাওনকে বললাম চল, টিএসসি এর ভেতরটাই গিয়ে বসি। গেলাম। তার আগে অবশ্য আমরা মজা করে আমরা অনেককিছু খেলাম। আমি ভেবেছিলাম, টিসএসসি এর ভেতর সুইমিংপুল এর ওইখানটাই বসবো। কিন্তু ঐটা আজ বন্ধ। কি আর করা, টিএসসির ফ্লোরেই বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। আর শাওনকে বলি, ফয়সাল ভাই কই, তার টিকিটিও তো নাই। শাওন বলে, অস্তির হচ্ছিস কেন, আসবে। লিণ্ডা আজ হঠাৎ করে বাসা থেকে বের হয়ে ঢাকা চলে এসেছে। ও থাকে নরসিংদিতে। এই হঠাৎ করে কিছু করাটা অনেক ইন্টারেস্টিং। আমিও মাঝে মাঝে যা কখনোই করিনা, তা হঠাৎ করে করে ফেলি।

লিণ্ডাকে বললাম, এই হঠাৎ করে ঢাকা চলে আসাটা সপ্তাহে একদিন করা যায়না, অত্যন্ত শুক্রবারে। হা হা। আমি জানি তা সম্ভব নয়, তবুও মজা করে বললাম। ওকে আমার হঠাৎ করে রাজশাহী চলে যাওয়ার ঘটনাটা বললাম। শাওন বলে, এইটা একদম একসেস। এইভাবে কেও যায়। লিণ্ডা হঠাৎ করে বললো, রোকন, আমি তোমার লুচি পায়েস খাবো। ওর মনে আছে! একদিন বলেছিলাম, ফেইসবুকে। আজিজ সুপার মার্কেটে একটা খাবারের দোকান আছে, নাম অন্তরে রেস্তোরা। মুন্না প্রথম আমাকে এইখানে নিয়ে এসেছিল। এরপর এই দোকানটাই আমি বেশ কয়েকবার আমার বন্ধুদের নিয়ে গিয়েছি। শাওনকেও নিয়ে গিয়েছিলাম একবার। এখানকার লুচি এবং গুরের পায়েসটা খুবই অসাধারণ। লিন অবশ্য বলছিল, ওর আম্মুর হাতের লুচি-পায়েস খেলে নাকি কখনো ভুলবো না। খাওয়ার ইচ্ছেটা মনের মধ্যে রেখে দিলাম। আমি জানি আমার কখনো নরসিংদিতে যাওয়া হবে না। আমি যাবোও না কখনো। আমার এক বন্ধুর বাড়ি সেখানটায়। ওর গল্প অন্যদিন বলবো। হঠাৎ করে বললাম, শাওন জানিস, ওই আমাকে ভুলে গেছে, ওর কোন কন্টাক্ট নাম্বারটাও আমার কাছে নাই। শাওন বলে ঠিক করছে, তোর সাথে এরকমি করা উচিৎ। আমিও বলি ঠিকই আছে। মানুষের প্রতি কারো অনেক এক্সপেক্টটেশান থাকলে, এবং তা যদি কখনোই পুরণ না হয়, আস্তে আস্তে তার প্রতি আগ্রহ কমে আসে, তার প্রতি ভাল লাগা গুলো মরে গিয়ে অন্য মানে হয়। নিজে থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া অনেকটা। হয়তো প্রচুর খারাপ লাগা থেকেই ও দূরে সরে যাওয়া। আমি ওর খুব ভাল বন্ধু হতে গিয়েও হয়তো হয়ে উঠতে পারিনি। হয়তো সময়ের প্রয়োজন, আরও অনেক কিছু। থাক সেইসব কথা।

শাওন বললো, ক্র্যাকটা আসছে মনে হয়। ওর ফোন বেজে উঠল। আমি লিনকে বলি চলো পালাই। শাওন ক্র্যাকটার সাথে কথা বলবে,আমরা একটু পর এসে পাশে দাড়িয়ে থাকবো, উনি তো আমাদের দু-জনের কাওকে চিনেন না। সুতরাং একটু মজা করি। । শাওন ফোন নিয়ে হাটতে হাটতে টিএসসি এর গেট পর্যন্ত গেল, আর এইদিকে আমরা পালানোর পথ খুজতেছিলাম। ও আচ্ছা, লিন, টিসএসিতে ওয়াশরুম কোথায় খুজতেছিল, আমি এইখানটাই খুব বেশি আসি নাই, তাই বলতে পারতেছিলাম না, হঠাৎ করে পেয়ে গেলাম। কিন্তু কনফিউসড, কোনটা জেন্টস আর কোনটা লেডিস। কখনো লেখা ছিল, কিন্তু এখন নেই, কেউ মুছে দিয়েছে। যাহোক, এক ভাইয়া দেখিয়ে দিল। আমি বারান্দায় বাদাম খেতে খেতে হাটতে লাগলাম। আর দেখছিলাম শাওনকে। ও কথা বলে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। একবার ওর কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বললাম, ক্র্যাকটা আসবে কিনা, ও বলল, আসবে আসবে। আমি আবার ফিরে এলাম ওয়াশরুমের কাছে। পাবলিক টয়লেট গুলোতে একটা ফালতু রকম ন্যাপথেলিন এর উৎকট গন্ধ থাকে। এইটা আমার একদম সহ্য হয় না। বের হয়ে এলাম, এখনো লিন বের হয়নি। আমি আবার পায়চারি করতে থাকি। অনেকক্ষণ পর যখন লিন বের হলো, আমি বললাম, এখনো আসে নাই, শাওনকে দেখো এখনো কথা বলেই যাচ্ছে। আমরা অবশ্য লুকানোর প্লান করছিলাম তখনো, কিন্তু টিসএসিতে পালনোর যায়গা কোথায়। লিনকে বললাম, চলো অডিটরিয়ামে ঢুকে পরি। অডিটরিয়ামে ফিল্ম ফেসটিভাল চলছিল। তখন দাবাঙ নামের অতি ফালতু মুভিটা চলছিল। লিন বলে, টিকিট কই, টিকিট ছাড়া তো ঢুকতে দেবে না। হুম, টিকিট তো নেই। সুতরাং এইটা বাদ। আচ্ছা দুতলায় উঠা যায়। শাওন বলে, এই ফয়সাল ভাই আসছে, চল। আমি বলি, তুই আগে যা, আমরা পরে আসি। ও যখন বাইরে গেল আমি লিনকে বলি, চলো দুতলায় যায়, আমি অবশ্য কখনো যায়নাই কি আছে দুতলায়। সিড়িতে উঠতেই একটা রুমে বেশ কিছু লোকজন ফ্লোরে বসে একটা অদ্ভুদ শব্দ জোরে জোরে বলছে। আমি বুঝলাম না ব্যপারটা কি। লিন বলে, এখানে সম্ভবত কবিতা আবৃতি শেখানো হয়। আমরা সিড়িটাতে বসলাম। কিছুক্ষণ পর শাওনের কল, আমি ধরলাম, ওই তোরা কই, ফয়সাল ভাইয়া তো আসছে। আমি গেইট এ। লিনকে বললাম, চলো আসছেন উনি। তারপর উনারা এলো, আমি আর লিন হাটছি, শাওন আর ফয়সাল ভাই পেছনে পেছনে। আমরা যেন উনাদের চিনি না। ওরা গল্প করছে, আমি আর লিনও গল্প করছি। লিন, এখনো আমাদের ঘুরতে হবে, আর সামনে চোখাচুখি হবে, এখন! সামনে তখন আর হাটার যায়গা নেই। লিন বলে, ইশ তাইতো। যাহোক কিছুক্ষণ পর আমরা সবাই বের হলাম। লিনকে বললাম, চলো এবার কথা বলি, অনেকক্ষণ তো হলো। হুম চলো। উনি টিএসসি এর চা স্টল থেকে সিগারেট এবং চা নিল। এইটা তার ব্র্যাকফাস্ট। সাধে কি আর ক্র্যাক বলি। উনার প্রথম কথা, আমার খুব খুধা লাগছে, চলো খাবো। কিন্তু লিন উনার গাড়িতে উঠবে না। লিন বলে এইখানে কোথাও বসি, উনি বলে কোথায়, এই মাটিতে বসবো? চলো মাটিতেই বসি। আমার গাড়িতে কিছু নেই, বোমা নেই, এই যে পুলিশ আছে চেক করতে বলো, এই বলে উনি অনেক মজার মজার গল্প বললেন। উনি ছোট সময় অনেক দুষ্ট ছিলেন। অনেক মজার সব ঘটনা। সত্যি কথা বলতে দুষ্টের শিরোমনী যাকে বলে, উনি তাই ছিলেন। সব করছেন। গাছের ডাব চুরি, অন্যের বাড়ির মুরগি চুরি থেকে ভিক্ষা করার মতো কিছু মজার ঘটনা উনি বললেন। মন্দির থেকে খাবার চুরি করে খাওয়া আরও নানা রকম মজার ঘটনা। একবার নাকি উনি একটা যায়গা থেকে রিকসায় উঠছেন, সেই যায়গায় আর কোন রিক্সা নেই। তো এক ভদ্রমহিলা (সম্ভবত মেয়ে) উনার কাছে লিফ্ট চাইছে। আর রিকসা নেই। তো উনি রাজি হয়েছেন। জিজ্ঞাসা করেন আপনি কোথায় যাবেন, মেয়েটি বলে এইতো সামনেই। ভাইয়া মজা করে, এইতো সামনে বলতে, আপনি যদি বেশি রাস্তা যান, তাইলে ভাড়া আপনি দিবেন,আর আমি যদি বেশি যায়, তাইলে ভাড়া আমি দেবো। মেয়েটি বলে সে কোন সমস্যা না। কিছু দূরে গিয়েই মেয়েটা তার কাছে টাকা চায়। ভাইয়া বুঝতে পারে, বলে ঠিক আছে, আমার টাকা আমি দেবো। কিন্তু আপনি এইভাবে বলছেন কেন, মনে হচ্ছে আপনি আমার চৌদ্দ গুষ্ঠির কাছে আপনি টাকা পান। মেয়েটি বলে, আমি কিন্তু চিৎকার করবো। ভাইয়া তাকে বুঝাতে চেষ্টা করে, এইখানে যদি আপনি চিৎকার করেন, তাইলে কার সমস্যা বেশি, আপনি মেয়ে মানুষ, চুরে শুনে না ধর্মের কাহিনী। ভাইয়া চিন্তা করতে থাকে, এখন যদি আমি দৌড় দেই, তাইলে পাবলিক এর মাইর একটাও মাটিতে পরবে না। চিন্তা করতে থাকে, এই সময একটা জেম, আর সেই সুযোগে ভু-দৌড়। এই সব আরো নানা মজার গল্প বলে। ছোট সময় একবার স্কুল থেকে পিকনিকএ গিয়েছিলেন। তো পিকনিক থেকে একটা ভদ্রমহিলা তাকে নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল। কিডন্যাপিং টাইপ কিছু। তার মজার গল্প। অবশেষে লিন রাজি হয়, গাড়িতে উঠতে। আমরা গাড়ি উঠি প্রায় তিনটার সময়। কোথায় যাবো! লিন মজা করে বলে, তোমার বাসায় যাবো, ক্র্যাক তাতেই রাজি। উনি টিএসসি দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে দিয়ে আবার কিছুক্ষণ পর টিএসসিতেই ফিরে আসি, আমি বলি ভাইয়া, আমরা তো এইখানেই ছিলাম কিছুক্ষণ আগে, লিন হেসে ফেলে। যাহোক, উনি গাড়ি চালায় কোন চিন্তা ভাবনা না করে। কোথায় যাবে তা উনি নিজেও যানে না। এর মধ্যে আমাকে একবার বলেছে ফিসফিস করে, তোমার খুধা লাগে নাই, সত্যি করে বলো। আমি বলি লাগছে। আমি সামনে বসছি ভাইয়ার সাথে পেছনে শাওন আর লিণ্ডা।
তো আমরা যখন সায়েন্স ল্যাব পার হচ্ছি, তখন উনি বলে তোমাদের কি বিশ মিনিট সময় হবে, আমি তোমাদের একটা যায়গায় নিয়ে যাবো, আমি বাজি ধরে বলতে পারি, তোমরা কখনো যাওনাই। আমরা রাজি হলাম।
আমরা যখন কল্যাণপুর এলাম, তখন লিনকে আমার সেই বিখ্যাত বিল্ডিংটা দেখালাম। আমি কল্যাণপুরে বেশকিছুদিন ছিলাম একটা বিশতলা বিল্ডিং এর দশতলায়। কিন্তু সেই বিল্ডিং এ কোন লিফ্ট ছিল না। বিল্ডিং টা এখনো আগের মতো নগ্নই রয়ে গেছে। শাওন বলে, ভাইয়া ঢাকায় ভুমিকম্প হলে তো, তুমি বেচে যাবা, তুমি তো সারারাত গাড়িতেই থাকো, বাসায় তো থাকো না।

অবশেষে আমরা সেই যায়গাটাই এলাম। যায়গাটার নাম হরিণধরা। এতো সুন্দর যায়গা আমি কখনো দেখি নাই। চারদিকে সাদার সমুদ্র। এতো কাশফুল আমি কখনো দেখি নাই। বিশাল মাঠে চারদিকে শুধু কাশফুল আর কাশফুল। গাড়িটি যখন কাশফুলের সমুদ্রের মাঝখানে দিয়ে যাচ্ছিল, কি যে এক অদ্ভুত ভাললাগা কাজ করতেছিল, মনে হচ্ছিল আমি হয়তো সর্গের পথে। ফয়ছাল ভাইয়াকে মনে হচচ্ছিল দেব শিশু। উনি আমাদে স্বর্গের পথ দেখিয়ি চলছেন। সত্যি এতো সুন্দরের মাঝে কখনো যায়নি। অসংখ্য ধন্যবাদ ফয়সাল ভাইয়াকে, আমাদের ক্র্যাক।

কিন্তু খূব সুন্দরের মাঝে বেশিক্ষণ থাকতে নেই। তাই উনি শুধু আমাদের পুরো যায়গাটা একবার ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরে চললেন। আমার খুব ইচ্ছে করছিল কিছুক্ষণ দাড়াই, কিছু ছবি তুলি। ভাইয়া বলে, থাক, এই যায়গাটাকে ছবিতে ধরার দরকার নেই। আমরা ফিরে চললাম আবার স্বর্গ থেকে আমাদের সেই চিরপরিচিত নরকে।  আদম শিশু স্বর্গ থেকে একবার বিতাড়িত হয়েছে, আবার কখনো কি ফিরে পাবে?

এর পরের গল্পটুকু একদম অন্যরকম। কিছু চরম এবং ভয়ংকর সত্যি এবং কিছুটা ভয় মিলে এক অদ্ভুত কিছু। সেই গল্পটা এখানে বলবো না। এই গল্পটা সম্পূর্ণ ভাল লাগার গল্প। অন্যদিন বলবো সেই গল্প কিংবা বলায় হবে না।

এরপরে আমরা ভাইয়ার সাথে প্রায় নয়টা পর্যন্ত ছিলাম। ফয়ছাল ভাইয়া দেব শিশু, স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিলেন আজ কিছুক্ষণের জন্য।

কিছু ছবি:
কাশফুল
 

This slideshow requires JavaScript.