আত্নশুদ্ধির পথে আত্ম উপলব্ধি

আমার মনে হয়, প্রত্যেকের ই দিনে একবার নিজেয়ে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে প্রশ্ন করা উচিৎ সে আসলে কে, নিজের পরিচয় জানাটা খুব জরুরী। নিজের মূল টাও জানা জরুরী। আমি কোথা থেকে এসেছি, এইটা জানতে পারলে আমি কোথায় যেতে চাই এই প্রশ্নের উত্তর সহজ হয়ে যায়।

আমি আমাদের এই উপমহাদেশের মানুষগুলো কিভাবে আসলো তা নিয়ে একটু পড়াশোনা করতে চাই, জানতে চাই, কিভাবে আমরা এলাম। অনেক জ্ঞানীগুণীরা শুরুতে বলে গেছেন, নিজেকে জানাটা অনেক বেশি জরুরী। নিজ কথাটা অনেক সময় ব্যক্তি নিজ না বুঝিয়ে সামগ্রিকও বুঝায়, মানে সামগ্রিক ভাবে আমরা। আমরা কোথা থেকে এলাম।

আমি ইতিহাসবেত্তা হবো না জানি, হওয়ার দরকারও নেই আমার, কিন্তু তবুও জানতে ইচ্ছে করে, কিভাবে কি হলো, অতীতের পরিক্রমা থেকে হয়তো সামনের পথ দেখা সম্ভব হবে না আমাদের এই সময়ে কারণ, এই সময়ের পরিবর্তন গুলো খুব দ্রুত হয়। কিন্তু অতীতের পরিবর্তন গুলো হতো খুব ধীরে, তিনশত বছর আগে এবং দুইশত বছর আগের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য দেখা যাবে না, কিন্তু এখন দশ বছর ব্যবধানের মাঝে বিশাল পার্থক্য ধরা পরবে।

এইযে আমি এখন বাংলায় লিখছি, এই বাংলা গদ্যরীতি শুরু করেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর বাবু না করলে জিনিসটা কেমন হতো? চিন্তা করলেই আজিব লাগে, আমি বসে বসে এখন হয়তো কবিতা লিখতাম, পদ্যে পদ্যে আমার মনের ভাব প্রকাশ করতাম। যাহোক, ঈশ্বরচন্দ্র সেই সময়ের একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি, তিনি আমাদের এই বাংলাকে অনেকদূর এগিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আমাদের কবি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে মজার কথা বলি, উনি কিন্তু কখনোই মনের মধ্যে ইচ্ছে পোষণ করেনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে লিখবেন। তার খুব ইচ্ছে ছিল ইংরেজি সাহিত্য সুনাম অর্জন করবেন, কিন্তু ইংরেজরা তা হতে দেন নি, ইংরেজরা নিজেদের নিয়ে বেশি সচেতন, কখনোই নিজেদের কর্তৃত্ব অন্যের হাতে দিতে চাইনি, এইটা আসলে এক অর্থে জাতীস্বচেতনা। আমারাই শুধু খুব বেশি সচেতন না। নিজেদের নিয়ে না ভেবে আমরা বেশি নিজেকে নিয়ে ভাবি, বলেই হয়তো আমরা এখনো আমরা। সব কিছু সামগ্রিক ভাবে হয়, একা কিছু করা সম্ভব না। আমি মাঝে মাঝে একটা উদাহরণ দেই, মানুষের মাঝে এক ধরণের আত্মবিধ্বংসি প্রবণতা আছে, মাঝে মাঝে আমরা নিজেদের ধ্বংস করে ফেলি। যেমন আমরা মানব জাতি, সুতরাং সমগ্র মানুষই আসলে আমরা নিজেরা, একটিকে ধ্বংস করা মানে, নিজেদেরই করা।

যাহোক, মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন ব্যর্থ কবি, তার কিছু করার রইলো না, তখন কেবল বাংলা সাহিত্যের গদ্য নিয়ে অনেকেই ভাবছেন, কিছু গল্প এবং নাটক লেখা হয়েছে, তো মাইকেল একদিন এগুলোর একটি দেখে নাক ছিটিয়েছিলেন। কি সব লিখে এইগুলা, তখন কে জানি ফূরণকেটেছিল, ইংরেজি সাহিত্যে কিছু করতে না পেরে এখন আসছে বাংলা সাহিত্যের সমালোচনা করতে, এইরকম, আমার সবটুকু মনে নেই, যাহোক, এইটা মাইকেল এর খুব লেগেছিল, তারপর থেকেই কিন্তু তিনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে উঠে পরে লেগে গেলেন। মাইকেল এর কবিতা আমরা সবাই পড়েছি, বিশেষ করে, আমার কপোতাক্ষ নদ সনেট টা মুখস্থ ছিল,

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে |

সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে ;

সতত ( যেমতি লোক নিশার স্বপনে

শোনে মায়া-যন্ত্রধ্বনি ) তব কলকলে

জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!—

বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?

দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি-স্তনে!

আর কি হে হবে দেখা?—যত দিন যাবে,

প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে

বারি-রূপ কর তুমি ; এ মিনতি, গাবে

বঙ্গজ-জনের কানে, সখে, সখা-রীতে

নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে

লইছে যে তব নাম বঙ্গের সঙ্গীতে!

যাহোক, আচ্ছা আমরা মনে হয় সবাই নীলদর্পন নাটকটি কথা জানি। এই নাটকটি কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্তই বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। মাইকেল এর একটা কথা আমার ভাল লাগে, সেটি হলো, আমি ব্যক্তিগত ভাবে কি করছি, সেটি যদি তোমার ক্ষতির কারণ না হয়ে দাড়ায়, তাহলে সেটি নিয়ে মাথা-ঘামিও না, বরং তোমাদের জন্য আমি কি করতে পারি, সেটা নিয়ে সমালোচনা করো। আমি এই জিনিসটা পছন্দ করি, পত্যেকেরই ব্যক্তিগত জীবন থাকে। একজন সেলিব্রেটির ও ব্যক্তিগত জীবন থাকে, সে আমাদের সবার জন্য কি করছে, আমরা বরং সেটি নিয়ে কথা বলি, তার নিজের জীবনটাকে নিয়ে কেন টানা হ্যাচড়া করবো? কিন্তু আমরা করি। খুব খারাপ একটা কাজ করি।

আমরা আজকের এই বাঙলী জাতির পেছনে বেশ কিছু লোকের অবাদান আছে, ঈশ্বরচন্দ্রের কথা বলেছি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের অনেকগুলো পথ খুলে দিয়ে গেছেন। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ বন্ধ করেছেন। আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বাংলাসাহিত্যের সাম্রাজ্য তৈরি করে দিয়ে গেছেন। আমার মনে হয়, বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্র নজরুল এবং জীবনানন্দ দাশ এই তিনজন যা দিয়ে গেছেন, আর কেও না থাকলেও সমস্যা ছিল না।

মাঝে মাঝে খুব অবাক হই, আমাদের তখনকার সময়গুলো কেমন অদ্ভুতই ছিল। মোঘলদের শাসন ছিল বৈচিত্র্যময়, আর ইংরেজদের শাসন ছিল পুরোটাই শোষনের। এদেশে তারা এসেছিল ব্যবসা করতে, ব্যবসা করতে এসে শোষণ শুরু করে। সেই ইতিহাস গুলো আসলে আমাদের জানা প্রয়োজন। আমরা হয়তো ইংরেজদের বিরুদ্ধে এখন প্রতিশোধ নিতে যাবো না,কিন্তু নতুন করে যাতে আবার শোষিত না হই, তাই জানা অনেক জরুরী।

একটি মজার তথ্য দেই, সেটি হলো মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতটি কিন্তু আবিষ্কার করেন রাধানাথ শিকদার নামে একজন বাঙালী গণিতবিদ।

নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা বইটা আমি অনেক ছোট বেলায় পড়ে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝে খুব অবাক হয়ে ভাবি, আমাদের এই উপমহাদেশ যারায় শাসন করেছেন, তাদের আসলে দেশের জনসাধারণদের নিয়ে কোন ভাবনা ছিল না। তারা নিজেদের খেয়াল খুশি মতো চলতেন, আর শোষণ করে যেতেন। দেশের সাধারণ জনগন না খেয়ে কষ্টে ভোগে মারা যেতেন, কিংবা শোষিত হতেই থাকতেন, এবং কোন একসময় ভুলেই যেতেন, তারও একটা জীবনবোধ আছে, মেনেই নিতেন এইটা নিয়তি। আমার মনে হয়, এখনো সেই শাসনের চিত্র পরিবর্তন হয় নি, এখনো আমাদের শাসকরা তাদের খেয়াল খুশি মতো চলেন, সাধারণদের কথা কখনো ভাবেন না। প্রতি পাঁচবছর পরপর একটা নাটক মঞ্চায়িত হয়, শাশক পরিবর্তনের,আমরা সাধারণরা সেটা আনন্দের সাথে দেখি, আমরা ধরেই নিয়েছি, এইটাই নিয়তি। কি অদ্ভুত।

দেশপ্রেম একটা অদ্ভুত ব্যাপার। দেশের প্রতি মায়া থাকাটা সত্যিই অদ্ভুত, দেশের জন্য নিজেকে আমাদের দেশে উৎসর্গ করেছে, তার উদাহরণ এতো এতো বেশি যে খাতায় লিখে রাখা সম্ভব হয়নি সব, কিন্তু কেন করেছেন তারা? কঠিন প্রশ্ন। একটা দেশ আসলে কি, একটা ভূ-খণ্ড আর দেশের মানুষ মিলেই তো একটা দেশ। মানুষ না থাকলে আসলে ভূ-খণ্ডের দরকার নেই। যেহেতু নেই, সুতরাং মানুষ আসলে দেশের মূল ব্যাপার। সুতরাং দেশ প্রেম আসলে তার আশে পাশের মানুষ গুলোকেই ভালবাসা।

যাহোক, নিজেকে জানার জন্য আসলে নিজের মূলটাও জানতে হবে, নিজের চারপাশটা জানতে হবে, আমি কি করতে চাই, তা ঠিক করতে হলে, আগে জানতে হবে আমি আসলে কে, কোথা থেকে এলাম। আমি যখন জানি কোথা থেকে এলাম সেটা জানা হয়ে গেলে জেনে যাবো আমি আসলে কোথায় যেতে চাই, শুধু মাত্র খেয়ে দেয়ে বেচে থাকার মধ্যে আসলে জীবনের সার্থকতা নেই, বরং সবাই মিলে আমার চারপাশের মানুষদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাঝে অনেক শান্তি, জীবনটা অনেক আনন্দের হয়।

3 thoughts on “আত্নশুদ্ধির পথে আত্ম উপলব্ধি

  1. লেখাটা অনেকক্ষন ধরে পড়লাম। সাথে গ্রুপে শেয়ার দিলাম।
    ভাল লাগল। বিশেষ করে নতুন একটা তথ্য জানালাম যেটা আগে জানতাম না।
    সেটি হলো মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতটি কিন্তু আবিষ্কার করেন রাধানাথ শিকদার নামে একজন বাঙালী গণিতবিদ।
    :):)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s