সম্রাট হুমায়ুন

সম্রাট হুমায়ুন সতীদাহ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি একবার ঘোড়া-ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে প্রজাদের দেখতে বের হয়েছিলেন, সামনে শ্মশানঘাট এ সতীদাহ হওয়া দেখে ফরমান জারি করে সতীদাহ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাধাদেয় জওহর নামে এক মশক-বাহক,সে সম্রাট এর পানি সরবরাহ করতো, “আলমপনা, গোস্তাকি মাফ হয়, আপনার সমস্ত প্রজা হিন্দু। আপনি ওদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে তারা বৈরি হয়ে উঠবে। আপনার জন্য শাসনকার্য পরিচালনা দুষ্কর হবে।”

আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল আল মুকাররাম, জামিই সুলতানাত-ই-হাকিকি ওয়া মাজাজি, সৈয়দ আল সালাতিন, আবুল মোজাফ্ফর নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ পাদশাহ, গাজি জিল্লুল্লাহ

কত বড়ো নামরে বাবা। এইটা ছিল সম্রাট হুময়ানের নাম।

মোঘল সম্রাটদের মধ্যে হুমায়ুন আমার খুব প্রিয়। লোকটা অনেক ভাল ছিলেন, তবে এই ভাল থাকার জন্য যে বৈশিষ্ট্য গুলো থাকা প্রয়োজন, তা এই সময়ের ভালত্ব দিয়ে বিচার করলে চলবে না। সিংহাসনে বসেই সম্রাটদের প্রথম কাজ থাকে তার শত্রুদের দমন করা। এর মধ্যে তাদের যদি ভাই থাকে, শুরুতেই ভাইদেরকে হত্যা করা আবশ্যক ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। এবং এই জন্য তিনি অনেকবার বিপদে পরেছেন, রাজ্য হারিয়েছেন। কিন্তু বারবার ক্ষমা করে দিয়েছেন। জিনিসটা বিরল। তিনি যখন রাজ্য হারা হয়ে পথে পথে, তখন তাকে পারস্য রাজা সাহায্য করেছিলেন। তার প্রথম কথায় ছিল, আপনি ভাইদের হত্যা করেননি কেনো? কি আশ্চর্য না? হুমায়ুনের ছোট ভাই কামরান মির্জা বারবার তাকে বিপদে ফেলেছেন, হুমায়ুনকে বন্দি করে হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন অনেকবার। কিন্তু তিনি বারবারই তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সম্রাটদের অনেক সময় মন অনেক শক্ত থাকতে হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ওনার মন অনেক দুর্বল ছিল। তবে হুমায়ুন অনেক ভাবে সৌভাগ্যবান ছিলেন। তাকে সবাই ভালবাসতো। তিনি সবার ভালবাসা না পেলে হয়তো মোঘল আমল হুমায়ুনের পরেই বিলুপ্ত হয়ে যেতো। সম্রাট বাবর হুমায়ুনের রোগ নিজের শরীরে নিয়ে পুত্রকে মুক্ত করেছিলেন। সেই গল্প আমরা সবাই জানি। তারপর তার সবচেয়ে ভাল সহচর ছিল বৈরাম খাঁ। তার সেনাপতি। বৈরাম খাঁ না তাকে সাহায্য না করলে হয়তো তিনি কখনোই সাম্রাজ্য ফিরে পেতেন না। ইতিহাসে দেখা যায়, হুমায়ুন বারবার পরাজিত হচ্ছেন। এর পেছনে অবশ্য তার খামখেয়ালী আর দুর্বল মনকে অনেকেই দায়ী করবেন। কিন্তু সেগুলোকে আমি খুব একটা খারাপ চোখে দেখি না। কারণ সেগুলো আসলে তাকে অনেক বেশি মহান করে তুলেছেন। তাকে তার শত্রুও ভাল বাসতেন। শের খাঁ যখন তাকে পরাজিত করার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, তখন তার সহচরদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল তারা যাতে কোন ভাবেই হুমায়ুনকে হত্যা না করে, তাকে যেন পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়। এইজন্য অবশ্য হুমায়ুন পর পর দুইবার বেচে যায়। শের খার সৈন্যরা দেখছে, হুমায়ুন পালিয়ে যাচ্ছে, ইচ্ছে করলেই তীর ছুড়ে তাকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু তা তারা করছে না, জিনিসটা সত্যিই অন্যরকম। শের খা নানা রকম ফন্দি ফিকির করে, হুমায়ুনকে পরাজিত করেন, হুমায়ুন ঘোড়া নিয়ে পানিতে ঝাপ দেন, ঘোড়া পানিতে ডুবে যায়, তখন নাজিম নাকে এক ভিস্তিওয়ালা তাকে বাতাস ভর্তি এক মশক ছুড়ে দেয়। হুমায়ুনের জীবন বাচানোর জন্য হুময়ান কথা দেয়, তাকে একদিনের জন্য তার সিংহাসনে বসাবেন। মজার ব্যাপার হলো সম্রাট সে কথা ভুলে যায় না, তিনি যখন দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তখন সেই ভিসতিওয়ালকে একদিনের জন্য সিংহাসনে বসান। হুমায়ুন মশক ধরে নদীর ওপারে উঠে খুব অসুস্থ হয়ে পরেন। তখন তাকে বাচায় লছমী বাই নামের এক সাধারণ মহিলা।

এভাবে নানাভাবে হুমায়ুন অন্যের ভালবাসা পেয়েছেন। তিনি নিশ্চয় মানুষটা অন্যের ভালবাসা পাওয়ার মতো ছিলেন।

তবে হুমায়ুন খুব খামখেয়ালী ছিলেন, এই বিষয়টি আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে। মোঘলদের অনেক দোষত্রুটি ছিল, নানা জন্য নানা ভাবে ব্যাখ্যা করছেন, কারো লেখা পড়লে মনে হবে এদের মতো নিষ্ঠুর কেও হতে পারে না, আবার কারো লেখায় তারা অনেক মহান ছিলেন। তবে আমি যতটুকু ইতিহাস জানি, খুব বেশি জানি না, ক্লাস থ্রি থেকে-নাইন পর্যন্তু যতটুকু ইতিহাস পড়েছি, তার সবই প্রায় ভুলে গেছি, সেগুলোর মধ্যে মোঘল আমলের সম্রাটদের মধ্যে হুমায়ুনকে খুব বেশি ভাল লেগেছে। সবদিক থেকে তিনি অনেক ব্লেজড ছিলেন।

মোঘল আমল নিয়ে আমি একটু পড়াশোনা করছি, মাঝে মাঝে নিজেকে সম্রাট সম্রাট মনে করতে ইচ্ছে হয়। তবে আমি মনে হয় হতে পারতাম না, সম্রাট হতে হলে তাদেরকে অনেক নিষ্ঠুর হতে হয়, তা হয়তো হতে পারতাম না। কাওকে হাতির পায়ের নিতে পিষ্ট করতে কিংবা গাধার চামরা ভেতর ভরে তা শুকিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর হওয়া খুবই কঠিন। কিন্তু এই ব্যাপার গুলো তাদের কাচে খুব সহজ ছিল। তাদের আত্মসম্মান ছিল প্রচুর। কন্যাকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে নিজে হত্যা করাটা বেশি ভাল মনে করতেন, তার মেয়ে এই নয় যে সে কন্যাকে ভালবাসেন না, হুমায়ুনের কন্যাকে অনেক ভালবাসতেন।

সম্রাটের মুখের কথায় আইন, কি আশ্চর্য একটা ব্যাপরই না ছিল। তিনি একটা ফরমান জারি করলেই সেটা আইন, সবাইকে তা শুনতে হবে। না শুনলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। রাজা বাদশাহদের জীবনে সুখ সাচ্ছন্দ্যের মধ্যে দিয়ে কেটেছে তা সত্যি কিন্তু তাদের জীবন নিয়ে সংশয়, মৃত্যুর ভয়াবহতা, যুদ্ধবিগ্রহ, রাজ্যদখল, প্রজা পালন এইসব ব্যাপারে একটা ভজঘট থেকে যা বুঝা তা হলো, তারা খুব বেশি সুখি ছিলেন না। তাছাড়া প্রজাদের জন্য তারা যে অনেক করতেন, তাও কিন্তু খুব  বেশি দেখা যায় না। বরং আমার কাছে কেন জানি মনে হয়, প্রজারা আসলে রাজাদের পালত।

তবে সেই মধ্যযোগের চেয়ে আমরা আসলে অনেক বেশি সুখে আছি, পৃথিবীতে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি কখনোই ছিল না। কখনো না কখনো যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই ছিল। এখনো তাই। বরং অতীতের চেয়ে আমরা বেশ সভ্য হয়েছি।

তবে আমার কেন জানি মনে হয়, হুমায়ুন সম্রাট না হয়ে যদি কবি হতেন, সাম্রাজ্য অন্যের হাতে দিয়ে তিনি নিজে পড়াশোনা করতেন, শিল্প সাহিত্য নিয়ে বসে থাকতেন তাহলে হয়তো আমরা একজন কবি পেতাম/সাহিত্যিক পেতাম।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s