মুহাম্মদ ইউনুস এবং সোসাল বিজনেস

মুহাম্মদ ইউনুস

এই দেশ বরেণ্য লোকটিকে দেখে আমি খুব অনুপ্রাণিত হই। এই লোকটি পৃথিবীর সবাই জানে, চিনে, সুতরাং নতুন করে আমি তার বর্ণনায় যাবো না। আমি তাকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে কিছু পড়াশোনা করলাম। তার অনেক কিছুই অনেক বেশি রকমকের ভাল লেগে গেছে। তার মধ্যে একটা হলো সামাজিক ব্যবসা।

সামাজিক ব্যবসা কিংবা সোসাল বিজনেস জিনিসটা একদম নতুন। মুহাম্মদ এই বিষটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন। তার অনেকগুলো বিডিও এবং ইন্টারভিও ক্লিপস দেখলাম। দেখে ভাল লাগল। বর্তমান পৃথিবীতে ব্যবসার ধরণ পরিবর্তন হয়ে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করতে চাই না, বরং তারা একটা সুন্দর নাম দিয়েছে সেটি হলো, বেনিফিট ম্যাক্সিমাইজ। তারা কতটুকু ইমপ্যাক্ট ফেলতে পেরেছে এইটা হিসাব করে থাকে।

প্রফিট আর বেনিফিট এর হিসেবটা কিভাবে করে সেটি বলি, আমি খুব ভাল বলতে পারবো তাও না, তবে ধারণা দিতে পারি, প্রফিট স্কেলটা সাধারণত টাকার অঙ্কের মাধ্যমে হিসেব করা হয়। বছরের শুরুতে কোম্পানি তাদের বাজেট দেয়, তারপর তারা একটা গোল ঠিক করে, এই বছরে তারা এতো পার্সেন্ট প্রফিট চায়। সেটা টাকার অংক। কিন্ত বেনিফিট জিনিসটা শুধু টাকা না। একটা উদাহরণ দেই, যেমন ক্যানোনিক্যাল এর কথা। এরা উবুন্টু বানায় এবং এইটা জনসাধারণের জন্য ফ্রি সাপ্লায় করে, বেশ কিছুদিন আগেও তাদেরকে এড্রেস দিলে, তাদের বাসায় পৌঁছে দিত, সে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক। আমি নিজেও একবার পেয়েছিলাম, পেয়ে কি যে পুলকিত এবং আনন্দিত হয়েছিলাম, তা বলে বুঝাতে পারবো না। যাহোক, উবুন্টুর কথাও আমরা জানি, এইটা একটা ওপেন সোর্স কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেম। যে কেও ফ্রিতে এবং বুক ফুলিয়ে পাইরেসির দরজাতে পা না দিয়ে কম্পিউটিং করতে পারে। তো যাহোক, ক্যানোনিক্যাল কিন্তু উবুন্টু প্রজেক্টে বছর শেষে কত টাকা প্রফিট হলো তা হিসেব করে না, বরং তারা চিন্তা করে, কতটা ইমপ্যাক্ট ফেললো, কতগুলো নতুন ইউজার পেলো, তাদের কয়টা ব্রাঞ্চ অপেন হলো, তাদের স্টাফ এর সংখ্যা কতগুলো হলো ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো হলো বেনিফিট এর হিসেব।

যাহোক এখন সোসাল বিজনেস নিয়ে আসি। এইটা কনভেনশনাল ব্যাংক এর মতো না, নতুন ধরণের একটা বিজনেস তবে সব কিছুই আগের মতো থাকবে, এখানে টাকা পয়সা থাকবে, ক্রেতা থাকবে, বিক্রেতা থাকবে এবং ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য প্রডাক্ট থাকবে। তাহলে পার্থক্য কোথায়? আছে, কনভেনশনাল বিজনেস প্রতিষ্ঠান গুলো প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করতে চায়। সুতরাং তাদের একটা চিন্তা থাকে, কিভাবে প্রডাক্ট কিংবা সার্ভিসটা বেশি দামে বিক্রয় করা যায়, কিংবা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই বিজনেস এর একটা বড়ো শর্তটা হলো এইভাবে চিন্তা করা যাবে না। কোন প্রডাক্ট কিংবা সার্ভিস ই বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না। প্রডাক্ট কিংবা সার্ভিস এর মূল্য হবে অনেক কম, যতটুকু না হলেই নয়। আচ্ছা, বিজনেস রান করতে হলে ক্যাপিটাল লাগে, লাগবেই, সেটা আসবে। সোসাল বিজনেস এবং কনভেনশনাল বিজনেস কনফ্লিক্টিং নয়, বরং পাশাপাশি থাকতে পারে। মাইক্রোসোফট ইচ্ছা করলে এইটা সোসাল বিজনেস চালাতে পারে। কিভাবে সেটা বলি, ধরা যাক, আমার ২০ লক্ষ টাকা আছে, সেটা দিয়ে আমি কনভেনশনাল বিজনেস করছি, সব ঠিক আছে। কিন্তু আমি এর পাশে আরও ৫ লক্ষ্য টাকা দিয়ে একটা সোসাল বিজনেস অপেন করতে পারি, সেটা হবে বেনিফিট ম্যাকিং এর জন্য। আমার বিজনে একটা প্রডাক্ট তৈরি করবে, সেটা হবে গুনগত, কিন্তু দাম কম। একটা সোপ তৈরি করলে সাধারণত ভেতরের প্রডাক্টের দাম সাথে লুক্রেটিভ র‍্যাপার, এডভারটাইসমেন্ট এবং আরও নানা রকম ইস্যু জড়িত থাকে, যার ফলে সোপটির কস্টিং বেরে যায়, এবং দামও অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু সোসাল বিজনেস সেগুলো নিয়ে চিন্তা করবে না। এই সাবানের জন্য ভাল লুক্রেটিভ র‍্যাপার দরকার নেই, বরং তার দরকামর সাবানের গুণগত মানটা ঠিক রাখা। তো আমার প্রডাক্ট/সার্ভিস এবং ক্রয় বিক্রয় চললো, আমি বলেছি আমি লাভ করবো না, সুতরাং আমি যা ইনভেস্ট করেছি, বছর শেষে আমার ইনভেস্টমেন্ট এর টাকাটা একই থাকছে, এভাবে টাকাটা রিসাইকল হতেই থাকবে। কিন্তু আমার বেনিফিট হবে, আমি কতগুলো ভোক্তা পেলাম, আমার কম্পানিতে কতগুলো লোকের কর্ম সংস্থান হলো ইত্যাদি ইত্যাদি। সোসাল বিজনেস মূল ব্যাপারটি হলো সমাজের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা এবং সেটা সমাধান করা এবং সেটি করার জন্য একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। সামাজিক সমস্যা গুলো কেমন হতে পারে, যেমন বেকার সমস্যা। আমরা সোসাল বিজনেস এর মাধম্যে বেকার সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি। আমাদের সামাজে দরিদ্র জনসাধারণ এর সংখ্যা বেশি, তারা যাতে কম টাকায় ভাল প্রডাক্ট এবং সার্ভিস পায়, তাও সোসাল বিজনেস এর লক্ষ্য হতে পারে।

যাহোক মুহাম্মদ ইউনুস এর এই আইডিয়াটা আমার অনেক বেশি ভাল লেগেছে। উনি বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন, এবং এই সোসাল বিজনেস এর বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। জিনিসটা দেখে ভাল লাগছে, বাংলাদেশের তেলাপোকা গুলো তাকে সম্মান না দিলেও বাইরের পৃথিবীর সবাই তাকে সম্মান করে, তিনি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই যান তা নয়, বিভিন্ন বড়ো বড়ো অর্গানাইজেশন এর প্রধান, দেশ প্রধান সবার সাথেই তার সখ্যতা আছে দেখা যায়। তিনি যে কত বড়ো মাপের মানুষ সেটা আমরা মনে হয় এখনো বুঝি নি, বুঝলে গ্রামীণ ব্যাংক এর সিইও পদ থেকে তাকে সরাতে চাইতাম না। মুহাম্মদ ইউনুস আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু কোনটিই কিন্তু তার নিজস্ব ব্যক্তিমালিকানাধীন নয়। তার নিজের স্বত্ব নেই, বরং স্বত্ব সেই প্রতিষ্ঠানের। তিনি ইচ্ছে করলেই কোটি কোটি টাকা নিজের পকেটে রাখতে পারতেন, কিন্তু তার সেই মানি অবসেসিভনেস নেই। তিনি বেনিফিট চান, প্রফিট নন।

আমার কেন জানি মনে হয়, আমি যদি দেশের বাইরে যাই, তাহলে কেও যদি জিজ্ঞাস করে, তুমি কোন দেশ থেকে এসেছো, আমি যদি বলি বাংলাদেশ, তাহলে সে হয়তো চোখ বড়ো বড়ো করে বলবে, ওয়াও তুমি মুহাম্মদ ইউনুস এর দেশে থেকে এসেছো।..

দীর্ঘজীবী হোন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s