ছোট গল্প : নীল ও নীলিমা

আকাশের অবস্থা শৌচনীয়। এখনি ঝুম বৃষ্টি হবে। কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে এবং ঘন ঘন বিদ্যুত চমকাচ্ছে। নীলু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। উত্তরের জানালা। সামনে একটা কাঠাল গাছ। একটা পাখি বসে ছিল একটি ডালে। সেটি উড়ে গেল। কয়েকটা পাতা নড়ে উঠল অমনি। নীলু পাতা নড়ে উঠা দেখল। মনটা আচানক আকাশের মেঘের মতো কালো হয়ে গেছে। আজ সারাদিন ভালই ছিল। এই বিকেলে হঠাৎ করে একরাশ ভারি মেঘ মনের উপর দিয়ে বয়ে যেতে শুরু করলো। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। প্রকৃতির সাথে মানুষের মনের বেশ সাদৃশ্য। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি নামবে। ঝড়ও হতে পারে। ঝড়ের পর, প্রকৃতি খুব স্নিগ্ধ হয়ে উঠে। খুব শান্ত হয়ে যায় চারপাশ। খুব ভাল লাগে তখন। মানুষের মনের মাঝেও এই ব্যপারটি ঘটে। নীলু দেখেছে তার যখন খুব কষ্ট লাগে, কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করলে পরে বেশ ভাল লাগে। নীলুর গায়ে একটা বৃষ্টি ফোটা পড়ল। বেশ বড়। অমনি ঝম ঝম করে বৃষ্টি পরতে শুরু করল। ওর খুব ইচ্ছে করছে, বৃষ্টিতে ভিজতে। কিন্তু তা করা যাবে না। নীলুর ঠাণ্ডার সমস্যা আছে। বৃষ্টিতে ভিজলেই নিওমোনিয়া লেগে যাবে। সর্দিকে নীলু খুব ভয় করে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই সমস্যাটা তার প্রায়ই হয়। তার জীবনটাই এরকম। যত অপছন্দের ব্যপারগুলো আছে, সেগুলো মুখোমুখি হয় বেশি। জানালাটা বন্ধ করে দিল। ঘর অন্ধকার হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে থাকা যাক। বৃষ্টির শব্দটা অনেক মজার। কিন্তু এই ঘর থেকে তেমন কিছু বুঝা যাচ্ছে না। পাকা বাড়ির সুবিধা গুলোর চেয়ে এই অসুবিধা নীলুকে বেশি খারাপ লাগায়। বর্ষাকালের সৌন্দর্যই হচ্ছে টিনের চালের ঝম ঝম বৃষ্টির শব্দ। সব ঋতুরই কিছু সৌন্দর্য আছে। বসন্ত কালের সৌন্দর্য হচ্ছে, কাঠফাটা রোদে হেটে এসে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া। নীলুর মাঝে মাঝে অন্ধকারকে ভাল লাগে। মানুষের সাথে অন্ধকারের বেশ সম্পর্ক আছে। এই যেমন মানুষ জন্মের পূর্বে থাকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। আবার অন্তিম কালেও অন্ধকারের উদ্দেশ্যে যাত্রা। বাইরে এখনো আধার হয়নি। ওর জানালায় একটা ফুটো আছে। নীলু উঠে গিয়ে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিল, যাতে ফুটো টা দেখা যায়। তারপর বিছানায় বসে পড়ল। তাকিয়ে রইল ঐ ফুটোটার দিকে। এই তাকানোর কোন অর্থ নেই। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ফুটো দিয়ে দেখা যাচ্ছে। পুরো ঘর অন্ধকার। ফুটো দিয়ে একখণ্ড আলো কেমন করে যেন নীলুর বুকের কাঁপনি থামিয়ে দিল। ভাবনা গুলো আজ বেড়াতে আসেনি। খোলা মাঠ, ফাকা মাথা, সবুজ ঘাসের ত্বকে শিশির পরেনি এখনো। এক ধরণের আলুনী, মনের মাঠে ঠাণ্ডা হাওয়ার খিল নেই। মনটা যেন কেমন করে থেমে আছে। কোথাও আজ যেতে চাইছে না। ঘোড়াতো ছুটেই বেড়ায়, কারণে অকারণে। মানুষের মনটা ঘোড়ার মতো। সারক্ষণ ছটফট করে বেড়ায়। আজ কারণ অকারণ কোনটায় ঘটছে না। নীলুর মনে হচ্ছে এই ফুটোটার দিকে তাকিয়ে অনন্তকাল পার করা সম্ভব। তার সময় যেন থেমে আছে। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, সময় আসলে ছুটে না। আমরা ছুটি। সময়কে পেছনে ফেলে ছুটি সামনের দিকে। সময় হচ্ছে একটা ট্রেন লাইন। আমরা সবাই ট্রেনেরে যাত্রী। একেক জনের স্টেশন একেক যায়গায়। নীলুর মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে হয়, তার স্টেশন কোথায়। সে কি থেমে আছে। যে কেন জানে না, কোথায় তার স্টেশন।

নীলুর কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করছে। অন্ধকারে কিছু লেখা যায় না। মোমবাতিটি জ্বালাল। মোমের আলোর অন্যরকম রঙ। ওর খুব ইচ্ছে হচ্ছে এই মোম শিখার হালকা প্রলেপটা গায়ে মাখতে। ও মাঝে মাঝে চিন্তা করে, গহীন কোন বনের মাঝে, মোমবাতির রঙের শাড়ি পর হারিয়ে যেতে। জোনাকী পোকার মালা গলায় দিয়ে কোন রুপালী রাতে ষরিষা ক্ষেতে দৌড়ে যেতে। কিন্তু এই ইচ্ছে গুলো সব সময় অপূর্ণ থেকে যায়। ওর ডায়রীটা বের করল, তারপর লিখতে শুরু করল,

“নিলয়, আমার ভালবাসার দ্বৈতসত্বার এক প্রহসণ। তাকে ক্ষ্যাপার পরশপাথরের মতই খুজেঁ ফিরি। যে হবে হরিণের চেয়ে চঞ্চল, মরিচিকার চেয়ে মায়াবী, আবার আকাশের চেয়ে বিশাল, বৃষ্টির মতোই নির্ঝর, যার বাস শুধু আমার ভিতরে, আমার অস্তিত্বে। কিন্তু ওর বাস এখন দুটি মানুষের ভেতরে। আমি এক করে আনতে পারবো না তাকে। একজনকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে অনূভব করেছি। আমার নিলয়ের কাছে শারীরিক ভালবাসা কিছুমাত্র। তাই হয়তো অপূর্ণতার খোব রেখে দিয়েছি কোথাও। মানুষ চায় পরিতৃপ্তি, আমার নিলয় তা চায়না। তাই সে শুধুই মানুষ,নিলয় নয়। আরেকজনের কাছ থেকে সেই কৈশোর থেকে নিলয় বেড়ে উঠার চেষ্টা করছে। কিন্ত ধীর কঠিন স্থির বাস্তবতার সাথে নিলয় পেরে উঠছে না। সে ছটফট করছে। একে হৃদয় দিয়ে অনুভবে আনতে পারি নি। তাই তার শরীর থেকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনতে চেয়েছিলাম আমার নীলময় ভালবাসা। নিলয়কে। কিন্তু সেখানে পেলাম শুধুই আবেদন। অবাক হলাম, সেখানে নিলয় থেকেও নেই।

শুধু দূর থেকে মাঝে মাঝে বুঝতে পারি ঐখানে আছে। হঠাৎ যেমন করে থাকে, তেমন হঠাৎ সে উধাও হয়ে যায় আমার একাকী কল্পনার দিগন্ত রেখার ধূলোময় মেঠো পথ ধরে আলোর কাছাকাছি। তাকে ছোয়া অসম্ভব। নীল আজ থেকে তুমি শুধু আমার ভেতরে থাকবে। আমাদের কল্পনার জগতে সাজবেলায় আমি তোমার বধু হবো।তোমার অস্তিত্ব শুধু আমাতে বিলীন হবে। কেও দেখবেনা আমাদের কল্পনাময় নীল ভালবাসাকে। তুমি আমার নীলয়। তুমি কারো ভিতরে থাকতে পারো না। তোমার অস্তিত্ব অদর্শণীয়। কেবল মাত্র অনুভূতিতে তোমার বাস। তোমাকে বৃথায় খুজি। তোমার পরিপূর্ণতা শুধু আমিই দিতে পারি। আজ তাই আমি দ্বৈত সত্বা, নিলয় ও নীলিমা।”

নীলু এইটুকু লিখে থেমে পরল। তারপর কিছুক্ষণ মোমবাতির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটানে ডায়েরী থেকে পাতাটি ছিড়ে ফেলল, এবং মোমবাতির আগুনে ধীরে ধীরে পাতাটি পুরে ফেলল।

One thought on “ছোট গল্প : নীল ও নীলিমা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s