প্রেম ও ভালবাসা

ভালবাসা নরম রোদের মতো, আলতো স্পর্শ দিয়ে যাওয়া,

তারপর দূরে থেকে হাসি দেখা, প্রেম যেন জীবনের সাথে

জীবনের মিলিয়ে চলা, প্রতি পদে, কখনো কঠোরতা আর

কখনো শুকনো রোদে কঠিন ঘামে পিচ্ছিল শরীর কিংবা

আবার কখনো ধানের শীষে রোদের ঝিকমিক আনন্দ।

ভালবাসা প্রেমে থেকে থেকে হারিয়ে যায় আবার পুরোটা জোড়ে থাকে।

ভালবাসা কাছে টানে প্রেমে আলিঙ্গন করে কিংবা দূরে সরিয়ে দেয়,

হারিয়ে যায় অস্থিত্ব কিন্তু মনের মাঝে সর্বক্ষণ ধিবধিব ধাবমান

নদীর মতো বয়ে যায়। হয়তো ভাবতেই থাকে সারাক্ষণ,

কিন্তু স্পর্শ চায় না। প্রেম চায় স্পর্শ, মিলনের প্রত্যাশিত চুম্বন

প্রেমকে গভীর করে আরো সমুদ্রের ঝাপটা এনে দেয়,

ফেনিল ঢেউয়ে ভেসে যায় মানবীয় নিছক মুখোস।

তাই ভালবাসাটাই আমার প্রিয়। তোমাকে ভালবাসতেই চাই,

গভীর করে, দূর অন্ধকার নক্ষত্রের ধারে বসে,

কিংবা সকালের রোদের ঝলকের মতো একবার দেখা দিয়ে।

UniBijoy / Unijoy Layout for Avro Keyboard

অভ্রে গুণগ্রাহীর সংখ্যা কম নয় বাংলাদেশে, আমি নিজেও অভ্র ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু সমস্যা হলো, আমি যখন অভ্র ছিল না, তখন আমরা অনেক বছর ধরে বিজয় ব্যবহার করে আসছি। সুতরাং আমাদের বিজয় কিবোর্ড লেআউট মোটামুটি ফিঙ্গার মেমোরিতে চলে এসেছে। অভ্রতে ফনেটকি ব্যবহারের সাধ অনেকেরই ভাল লেগেছে বিশেষ করে যারা নতুন বাংলা টাইপ করা শিখছে, কিন্তু আমি জানি বিস্তর লোক আছে যাদের অভ্রের ফনেটিক টা ঠিক পছন্দ হয়ে উঠেনি। তার মধ্যে আমিও একজন। আমি এখনও বিজয় লেআউটটা পছন্দ করি। ফনেটিক এ লিখতে এক ধরণের অসস্থি হয়। মজার ব্যপার হলো, ছোটবেলায় আমার ইংরেজি টাইপিং এর চেয়ে বাংলা স্পিড ই বেশি ছিল। যাহোক, যেহেতু অভ্রের মূল সফটওয়্যার থেকে ইউনিজয় লেআউটটি বাদ দেওয়া হয়েছে, সুতরাং এটি একটা সমস্যার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার কাছে, কোথায় পাই সেই ইউনিজয়। অবশেষে অনেক খুঁজে ইউনিজয় লেআউটটি পেলাম।
এখানে তাই শেয়ার করছি।

layout: download link

খুব সহজ, অভ্র ইন্সটল করা থাকলে, এই লেআউটটি ডাউনলোড করে ডাবল ক্লিক করলেই ইন্সটল হয়ে যাবে, তারপর এপ্লিক্যাশান রিস্টার করলেই পাওয়া যাবে ইউনিজয় লেআউটটি।

বৃষ্টির নৃত্য

বৃষ্টি!! বৃষ্টি!! সন্ধ্যা হতে অল্প–বিস্তর বাকি। সারাদিন কিছু খায় নি, সুতরাং পেটের ভেতর এক ভাগিনী থাকে, কিছু সময় পরপর সে ঘণ্টা পেটায়, সে এবার অবিরাম ঘণ্টা বাজিয়ে চলছে, খাবার চাই, চাই। যদিও আমি খুব বেশি পাত্তা দেই না, না খেয়ে অলস সময় কাটিয়ে দেওয়ার একটা আনন্দ আছে। বের হলাম, আকাশ গুড়ুম গুড়ুম। এখনি বৃষ্টি নামবে, বুদ্ধিমান কেও ঘর থেকে বের হবে না, আমি বুদ্ধিমান নয়, অনেকটা পাগল পাগল। তাই বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বের হয়ে গেলাম। তারপর নীলক্ষেত একটা রেস্টুরেন্ট এ পেটভরে খেলাম। খাওয়ার আনন্দই বা কম কি। পৃথিবীর সবটাই আনন্দ।তবে এই সবটাই আনন্দ সবাই বুঝতে পারে না, বিশেষ করে যারা বুদ্ধিমান এবং পুষ্টিকর। পৃথিবীতে সবাই পুষ্টিকর জীবন চায় বলে জীবনটা এতো নিরামিষ। আনন্দের জন্যে কোন বাধা ধরা নিয়ম নেই। যে কোন কিছুতেই আনন্দ খুঁজে নেওয়া যায়। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, রেস্টুরেন্ট এ ভেতর থেকেই তা বুঝতে পারলাম। প্রচণ্ড ভিজতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে যখন করছে তখন না ভিজে থাকাটার অর্থ হলো আনন্দ থেকে নিজেকে ডিপ্রাইভড করা। সুতরাং ভিজে বের হলাম। কি আনন্দ আর আনন্দ। হেটে হেটে বাসায় ফিরবো। রাস্তায় তাকিয়ে দেখলাম, সবাই কেমন ব্যতিব্যস্ত, বৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করতে।কেমন জানি লজ্জা লজ্জা ব্যপার। বৃষ্টি তো সব সময় আসে না, তাকে বরণ করে নিতে হয়, বৃষ্টিতে উদ্বাহু নাচতে হয়, আনন্দ করতে হয়। কিন্ত সবাই তো আমার মতো পাগল নয়, সবাই রেশনাল। পৃথিবী বড্ডো বেশি রেশনাল মানুষে ভরে গেছে। কোন মানে হয় না। ভেবে দেখলাম পৃথিবীর মানুষগুলো খানিকটা পাগল হলেই বরং ভাল ছিল, পৃথিবী অন্যরকম হতো, অনেক আনন্দের হতো। সম্রাট শাহজাহান খানিকটা পাগল ছিলেন বলেই তাজমহল বানিয়ে ছিলেন। পাগলরা যখন যা খুশি করতে পারে, তার যখন যা খুশি তা করে ফেলার মধ্যেই না আনন্দ। যেমন ধুম করে কাওকে ভালবেসে ফেলতে পারে। অবশ্য এতে সামান্য সমস্যাও আছে। থাক সে সমস্যা। আজ আনন্দের কথাই লিখবো। হেটে হেটে বাসায় ফিরলাম। বাসার কাছে এসে আমার রুমমেটকে ফোন দিলাম। সজিব এলো। ওকে আমার ফোন, মানিব্যাগ দিয়ে বললাম, চা করো তো, আমি ছাদে যাই। ছাদে গেলাম। গিয়ে দেখি একটা ছেলে বৃষ্টিতে ভিজছে আর নাচছে। দেখে আনন্দে ভরে গেলো মনটা। যাক একজন সঙ্গি তো পাওয়া গেল। তারপর দুজন মিলে বৃষ্টিতে ভিজলাম অনেকক্ষণ। কি আনন্দ। খুব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল, হে ঢাকাবাসী, বৃষ্টি এসেছে বৃষ্টি, সবাই বেরিয়ে এসো ঘর ছেড়ে। সবাই আনন্দ মিছিল করো। কি আনন্দ। কিন্তু আমি কিনা খানিকটা রেশনাল, তাই চিৎকারটা শব্দ করে না দিয়ে মনে মনেই দিলাম। আকাশে বিদ্যুৎ চমকানোর দৃশ্যে ছোটবেলা অনেক ভয় পেতাম, কিন্তু এখন অন্যরকম আনন্দ লাগে, কি সুন্দর আকা বাঁকা আলোর ঝলক, সেই আলোতে আকাশের মেঘ দেখা যায়। তারপর গুড়ুম গুড়ুম শব্দ। অসাধারণ। এই আনন্দটা কাওকে বলতে ইচ্ছে করছিল। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে তাকে যদি বলতে পারতাম কিংবা তার হাত ধরে এক সাথেই ভিজতে পারতাম, তাহলে…. । কিন্তু সে কি বুঝতে পারে, আমি কতটা ধারণ করেছি তাকে নিজের মধ্যে। হয়তো সেও রেশনাল, আমার মতো পাগল নয়, হলে অনেক ভাল হতো, আমি নিশ্চিন্ত মনে তাকে আমার সমস্ত আনন্দই তাকে দিয়ে দিতে পারতাম তারপর উদ্বাহু নৃত্যে আকাশ বাতাস সবকিছুকেই জানিয়ে দিতাম।

হঠাৎ বসন্ত

এ কোন নয় দেখার গভীর অনুক্ষণ

হঠাৎ এলে, নয়নে নয়নাভিরাম হলো এক

জানি না, কি প্রহেলিকায় আমার মন

ভরে গেল মিলে গেল সব, এক এক প্রত্যেক।

 

অঙ্গে তব লীলা-উৎপল বিচ্ছুরণ বিদ্যুৎ-সম ঝলকানি খেলে

অবনী ‘পরে সব সুখ পাখি হঠাৎ পাখা দিল মেলে

আনন্দ যে হঠাৎ আচমকা মেনে নিল সব বিশুদ্ধ উচ্চারণে

সচকিত মন আলোক সুন্দর দৃষ্টির ফেয়ার তব পানে

 

এতো সুন্দর মুখ তব যেন ঈষৎ সুমিষ্ট হাওয়াই মিঠাই

কেন এমন শুভ্রনীল লুকিয়ে ছিল আধারে কেও দেখে নাই?

আজই এ বসন্তে ফাগুন ঝরা দিনে উৎসব হৃদয় মনে

শুধু বলি অনুরণিত সত্য কথা, এ জীবন নিষ্ফল তুমি বিহনে।।

 

 

অনেক আগের লেখা একটা কবিতা। অনেকদিন পর খুজে পেলাম। ছোটবেলার লেখা… :) :)

এইসব দিন রাত্রি

Reblogged from নির্ঝরিণী:

Click to visit the original post

Image via Wikipedia

মনে রাখা এবং ভুলে যাওয়া দুটিই কঠিন। হয়তো তুমি একটি জিনিস খুব করে মনে রাখতে চাও, কিন্তু তুমি আসলে সেটি কোন না কোন ভাবে ভুলে যাবে। আবার ভুলে যাওয়ার ব্যপারটি আরও কঠিন।

তুমি ঠিক কাওকে খুব করে ধরে রাখতে চাও, তাকে তুমি তোমার মতো করে নিতে চাও, কিন্তু তুমি দেখবে সে তোমার হতে আসবে না, বরং তোমাকে তার মতো হয়ে যেতে হবে অথবা তাকে হারিয়ে ফেলবে; এবং যখন হারিয়ে ফেলবে, তুমি তাকে ভুলে যেতে চাইবে, কিন্তু তা হবার নয়। তুমি আরও বেশি বেশি করে তাকে মনে করে কষ্ট পেতে থাকবে।

যারা প্রোগ্রামিং শিখতে চায়

শুরুতে বলে রাখি, পৃথিবীতে সৃজনশীল কাজের অভাব নেই। যারা মনে করে জীবন মানেই শিল্প, তারা নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে কাজ করতে পছন্দ করে, সেই কাজগুলো হয় সম্পূর্ণ নিজের ভালা লাগার জন্য, সখের জন্য। সখ ব্যপারটি অনেক সময় সাদা হাতির মত হলেও আসলে কিছু কিছু বিশেষ সখ আছে, যা শুধুমাত্র সাদা হাতির মত মূল্যবান না, সাথে আরও অনেক কিছু। প্রোগ্রামিং এমন একটি সৃজনশীল কাজ। তোমার জন্য এটি হতে পারে সম্পূর্ণ নূতন ভুবন, তুমি যতোই এর ভেতরে প্রবেশ করবে, ততই তোমার কাছে নতুন মনে হবে,তুমি হারিয়ে যাবে, আর হারিয়ে গিয়ে তুমি দিশেহারা হবে না, বরং আরও বেশি আনন্দ পাবে, তুমি আরও বেশি বেশি করে হারিয়ে যেতে চাইবে। কম্পিউটার মূলত একটা যন্ত্র হলেও এটি খুব বেশি যন্ত্রের মতো না, এটি বরং মানুষের খুব বেশি কাছাকাছি। আমরা এই যন্ত্রটিকে এখন অনুভব করতে পারি, তাকে দিয়ে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলতে পারি। আমাদের মনের যত ধরণের কল্পনা থাকে, এই যন্ত্রটিকে দিয়ে তা বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারি।

এখন বলি প্রোগ্রামিং কি? মানুষের নিজস্ব একটি ভাষা থাকে, সেই ভাষায় আমরা কথা বলি, আমরা এই ভাষার নানা রকম কাজ করে থাকি, ধরো তুমি কাওকে দিয়ে কোন কাজ করিয়ে নিতে চাও, তাহলে তাকে তোমার কাজটি কেন বুঝিয়ে দিতে হবে, কিভাবে করবে, তাও বলে দিতে হবে। ঠিক এই ব্যাপারটি কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও সত্য। তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, সেই কাজটি সে কিভাবে করবে। কম্পিউটার আসলে যে কাজটি করে, আমরা যা তাকে করতে বলি, সেটি খুব দ্রুত করে ফেলে। সে নিজে থেকে কিছু করতে পারে না, তাকে দিয়ে করিয়ে নিতে হয়। এখন তাকে দিয়ে করিয়ে নিতে হলে, তাকে কিছু নির্দেশনা দিতে হয়। এই নির্দেশনা দেওয়ার কিছু নিয়ম কানুন আছে, যাতে করে কম্পিউটার তোমার কথাটি বুঝতে পারে। এই নিয়ম কানুনের সমষ্টিই হলো মূলত প্রোগ্রামিং।

কম্পিউটারের এই সৃজনশীল ভুবনে যারা আসতে চাও, তাদের বলে রাখি, এইটা আসলে সেইরকম মজার জিনিস। এই ভুবনে মজা পেতে হলে তোমাকে যা যা থাকতে হবে, তা হলো, প্রচুর ইচ্ছে শক্তি, ধৈর্য্য এবং ধৈর্য্য।

আত্নশুদ্ধির পথে আত্ম উপলব্ধি

আমার মনে হয়, প্রত্যেকের ই দিনে একবার নিজেয়ে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে প্রশ্ন করা উচিৎ সে আসলে কে, নিজের পরিচয় জানাটা খুব জরুরী। নিজের মূল টাও জানা জরুরী। আমি কোথা থেকে এসেছি, এইটা জানতে পারলে আমি কোথায় যেতে চাই এই প্রশ্নের উত্তর সহজ হয়ে যায়।

আমি আমাদের এই উপমহাদেশের মানুষগুলো কিভাবে আসলো তা নিয়ে একটু পড়াশোনা করতে চাই, জানতে চাই, কিভাবে আমরা এলাম। অনেক জ্ঞানীগুণীরা শুরুতে বলে গেছেন, নিজেকে জানাটা অনেক বেশি জরুরী। নিজ কথাটা অনেক সময় ব্যক্তি নিজ না বুঝিয়ে সামগ্রিকও বুঝায়, মানে সামগ্রিক ভাবে আমরা। আমরা কোথা থেকে এলাম।

আমি ইতিহাসবেত্তা হবো না জানি, হওয়ার দরকারও নেই আমার, কিন্তু তবুও জানতে ইচ্ছে করে, কিভাবে কি হলো, অতীতের পরিক্রমা থেকে হয়তো সামনের পথ দেখা সম্ভব হবে না আমাদের এই সময়ে কারণ, এই সময়ের পরিবর্তন গুলো খুব দ্রুত হয়। কিন্তু অতীতের পরিবর্তন গুলো হতো খুব ধীরে, তিনশত বছর আগে এবং দুইশত বছর আগের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য দেখা যাবে না, কিন্তু এখন দশ বছর ব্যবধানের মাঝে বিশাল পার্থক্য ধরা পরবে।

এইযে আমি এখন বাংলায় লিখছি, এই বাংলা গদ্যরীতি শুরু করেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর বাবু না করলে জিনিসটা কেমন হতো? চিন্তা করলেই আজিব লাগে, আমি বসে বসে এখন হয়তো কবিতা লিখতাম, পদ্যে পদ্যে আমার মনের ভাব প্রকাশ করতাম। যাহোক, ঈশ্বরচন্দ্র সেই সময়ের একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি, তিনি আমাদের এই বাংলাকে অনেকদূর এগিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আমাদের কবি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে মজার কথা বলি, উনি কিন্তু কখনোই মনের মধ্যে ইচ্ছে পোষণ করেনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে লিখবেন। তার খুব ইচ্ছে ছিল ইংরেজি সাহিত্য সুনাম অর্জন করবেন, কিন্তু ইংরেজরা তা হতে দেন নি, ইংরেজরা নিজেদের নিয়ে বেশি সচেতন, কখনোই নিজেদের কর্তৃত্ব অন্যের হাতে দিতে চাইনি, এইটা আসলে এক অর্থে জাতীস্বচেতনা। আমারাই শুধু খুব বেশি সচেতন না। নিজেদের নিয়ে না ভেবে আমরা বেশি নিজেকে নিয়ে ভাবি, বলেই হয়তো আমরা এখনো আমরা। সব কিছু সামগ্রিক ভাবে হয়, একা কিছু করা সম্ভব না। আমি মাঝে মাঝে একটা উদাহরণ দেই, মানুষের মাঝে এক ধরণের আত্মবিধ্বংসি প্রবণতা আছে, মাঝে মাঝে আমরা নিজেদের ধ্বংস করে ফেলি। যেমন আমরা মানব জাতি, সুতরাং সমগ্র মানুষই আসলে আমরা নিজেরা, একটিকে ধ্বংস করা মানে, নিজেদেরই করা।

যাহোক, মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন ব্যর্থ কবি, তার কিছু করার রইলো না, তখন কেবল বাংলা সাহিত্যের গদ্য নিয়ে অনেকেই ভাবছেন, কিছু গল্প এবং নাটক লেখা হয়েছে, তো মাইকেল একদিন এগুলোর একটি দেখে নাক ছিটিয়েছিলেন। কি সব লিখে এইগুলা, তখন কে জানি ফূরণকেটেছিল, ইংরেজি সাহিত্যে কিছু করতে না পেরে এখন আসছে বাংলা সাহিত্যের সমালোচনা করতে, এইরকম, আমার সবটুকু মনে নেই, যাহোক, এইটা মাইকেল এর খুব লেগেছিল, তারপর থেকেই কিন্তু তিনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে উঠে পরে লেগে গেলেন। মাইকেল এর কবিতা আমরা সবাই পড়েছি, বিশেষ করে, আমার কপোতাক্ষ নদ সনেট টা মুখস্থ ছিল,

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে |

সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে ;

সতত ( যেমতি লোক নিশার স্বপনে

শোনে মায়া-যন্ত্রধ্বনি ) তব কলকলে

জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!—

বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?

দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি-স্তনে!

আর কি হে হবে দেখা?—যত দিন যাবে,

প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে

বারি-রূপ কর তুমি ; এ মিনতি, গাবে

বঙ্গজ-জনের কানে, সখে, সখা-রীতে

নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে

লইছে যে তব নাম বঙ্গের সঙ্গীতে!

যাহোক, আচ্ছা আমরা মনে হয় সবাই নীলদর্পন নাটকটি কথা জানি। এই নাটকটি কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্তই বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। মাইকেল এর একটা কথা আমার ভাল লাগে, সেটি হলো, আমি ব্যক্তিগত ভাবে কি করছি, সেটি যদি তোমার ক্ষতির কারণ না হয়ে দাড়ায়, তাহলে সেটি নিয়ে মাথা-ঘামিও না, বরং তোমাদের জন্য আমি কি করতে পারি, সেটা নিয়ে সমালোচনা করো। আমি এই জিনিসটা পছন্দ করি, পত্যেকেরই ব্যক্তিগত জীবন থাকে। একজন সেলিব্রেটির ও ব্যক্তিগত জীবন থাকে, সে আমাদের সবার জন্য কি করছে, আমরা বরং সেটি নিয়ে কথা বলি, তার নিজের জীবনটাকে নিয়ে কেন টানা হ্যাচড়া করবো? কিন্তু আমরা করি। খুব খারাপ একটা কাজ করি।

আমরা আজকের এই বাঙলী জাতির পেছনে বেশ কিছু লোকের অবাদান আছে, ঈশ্বরচন্দ্রের কথা বলেছি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের অনেকগুলো পথ খুলে দিয়ে গেছেন। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ বন্ধ করেছেন। আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বাংলাসাহিত্যের সাম্রাজ্য তৈরি করে দিয়ে গেছেন। আমার মনে হয়, বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্র নজরুল এবং জীবনানন্দ দাশ এই তিনজন যা দিয়ে গেছেন, আর কেও না থাকলেও সমস্যা ছিল না।

মাঝে মাঝে খুব অবাক হই, আমাদের তখনকার সময়গুলো কেমন অদ্ভুতই ছিল। মোঘলদের শাসন ছিল বৈচিত্র্যময়, আর ইংরেজদের শাসন ছিল পুরোটাই শোষনের। এদেশে তারা এসেছিল ব্যবসা করতে, ব্যবসা করতে এসে শোষণ শুরু করে। সেই ইতিহাস গুলো আসলে আমাদের জানা প্রয়োজন। আমরা হয়তো ইংরেজদের বিরুদ্ধে এখন প্রতিশোধ নিতে যাবো না,কিন্তু নতুন করে যাতে আবার শোষিত না হই, তাই জানা অনেক জরুরী।

একটি মজার তথ্য দেই, সেটি হলো মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতটি কিন্তু আবিষ্কার করেন রাধানাথ শিকদার নামে একজন বাঙালী গণিতবিদ।

নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা বইটা আমি অনেক ছোট বেলায় পড়ে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝে খুব অবাক হয়ে ভাবি, আমাদের এই উপমহাদেশ যারায় শাসন করেছেন, তাদের আসলে দেশের জনসাধারণদের নিয়ে কোন ভাবনা ছিল না। তারা নিজেদের খেয়াল খুশি মতো চলতেন, আর শোষণ করে যেতেন। দেশের সাধারণ জনগন না খেয়ে কষ্টে ভোগে মারা যেতেন, কিংবা শোষিত হতেই থাকতেন, এবং কোন একসময় ভুলেই যেতেন, তারও একটা জীবনবোধ আছে, মেনেই নিতেন এইটা নিয়তি। আমার মনে হয়, এখনো সেই শাসনের চিত্র পরিবর্তন হয় নি, এখনো আমাদের শাসকরা তাদের খেয়াল খুশি মতো চলেন, সাধারণদের কথা কখনো ভাবেন না। প্রতি পাঁচবছর পরপর একটা নাটক মঞ্চায়িত হয়, শাশক পরিবর্তনের,আমরা সাধারণরা সেটা আনন্দের সাথে দেখি, আমরা ধরেই নিয়েছি, এইটাই নিয়তি। কি অদ্ভুত।

দেশপ্রেম একটা অদ্ভুত ব্যাপার। দেশের প্রতি মায়া থাকাটা সত্যিই অদ্ভুত, দেশের জন্য নিজেকে আমাদের দেশে উৎসর্গ করেছে, তার উদাহরণ এতো এতো বেশি যে খাতায় লিখে রাখা সম্ভব হয়নি সব, কিন্তু কেন করেছেন তারা? কঠিন প্রশ্ন। একটা দেশ আসলে কি, একটা ভূ-খণ্ড আর দেশের মানুষ মিলেই তো একটা দেশ। মানুষ না থাকলে আসলে ভূ-খণ্ডের দরকার নেই। যেহেতু নেই, সুতরাং মানুষ আসলে দেশের মূল ব্যাপার। সুতরাং দেশ প্রেম আসলে তার আশে পাশের মানুষ গুলোকেই ভালবাসা।

যাহোক, নিজেকে জানার জন্য আসলে নিজের মূলটাও জানতে হবে, নিজের চারপাশটা জানতে হবে, আমি কি করতে চাই, তা ঠিক করতে হলে, আগে জানতে হবে আমি আসলে কে, কোথা থেকে এলাম। আমি যখন জানি কোথা থেকে এলাম সেটা জানা হয়ে গেলে জেনে যাবো আমি আসলে কোথায় যেতে চাই, শুধু মাত্র খেয়ে দেয়ে বেচে থাকার মধ্যে আসলে জীবনের সার্থকতা নেই, বরং সবাই মিলে আমার চারপাশের মানুষদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাঝে অনেক শান্তি, জীবনটা অনেক আনন্দের হয়।

মুহাম্মদ ইউনুস এবং সোসাল বিজনেস

মুহাম্মদ ইউনুস

এই দেশ বরেণ্য লোকটিকে দেখে আমি খুব অনুপ্রাণিত হই। এই লোকটি পৃথিবীর সবাই জানে, চিনে, সুতরাং নতুন করে আমি তার বর্ণনায় যাবো না। আমি তাকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে কিছু পড়াশোনা করলাম। তার অনেক কিছুই অনেক বেশি রকমকের ভাল লেগে গেছে। তার মধ্যে একটা হলো সামাজিক ব্যবসা।

সামাজিক ব্যবসা কিংবা সোসাল বিজনেস জিনিসটা একদম নতুন। মুহাম্মদ এই বিষটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন। তার অনেকগুলো বিডিও এবং ইন্টারভিও ক্লিপস দেখলাম। দেখে ভাল লাগল। বর্তমান পৃথিবীতে ব্যবসার ধরণ পরিবর্তন হয়ে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করতে চাই না, বরং তারা একটা সুন্দর নাম দিয়েছে সেটি হলো, বেনিফিট ম্যাক্সিমাইজ। তারা কতটুকু ইমপ্যাক্ট ফেলতে পেরেছে এইটা হিসাব করে থাকে।

প্রফিট আর বেনিফিট এর হিসেবটা কিভাবে করে সেটি বলি, আমি খুব ভাল বলতে পারবো তাও না, তবে ধারণা দিতে পারি, প্রফিট স্কেলটা সাধারণত টাকার অঙ্কের মাধ্যমে হিসেব করা হয়। বছরের শুরুতে কোম্পানি তাদের বাজেট দেয়, তারপর তারা একটা গোল ঠিক করে, এই বছরে তারা এতো পার্সেন্ট প্রফিট চায়। সেটা টাকার অংক। কিন্ত বেনিফিট জিনিসটা শুধু টাকা না। একটা উদাহরণ দেই, যেমন ক্যানোনিক্যাল এর কথা। এরা উবুন্টু বানায় এবং এইটা জনসাধারণের জন্য ফ্রি সাপ্লায় করে, বেশ কিছুদিন আগেও তাদেরকে এড্রেস দিলে, তাদের বাসায় পৌঁছে দিত, সে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক। আমি নিজেও একবার পেয়েছিলাম, পেয়ে কি যে পুলকিত এবং আনন্দিত হয়েছিলাম, তা বলে বুঝাতে পারবো না। যাহোক, উবুন্টুর কথাও আমরা জানি, এইটা একটা ওপেন সোর্স কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেম। যে কেও ফ্রিতে এবং বুক ফুলিয়ে পাইরেসির দরজাতে পা না দিয়ে কম্পিউটিং করতে পারে। তো যাহোক, ক্যানোনিক্যাল কিন্তু উবুন্টু প্রজেক্টে বছর শেষে কত টাকা প্রফিট হলো তা হিসেব করে না, বরং তারা চিন্তা করে, কতটা ইমপ্যাক্ট ফেললো, কতগুলো নতুন ইউজার পেলো, তাদের কয়টা ব্রাঞ্চ অপেন হলো, তাদের স্টাফ এর সংখ্যা কতগুলো হলো ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো হলো বেনিফিট এর হিসেব।

যাহোক এখন সোসাল বিজনেস নিয়ে আসি। এইটা কনভেনশনাল ব্যাংক এর মতো না, নতুন ধরণের একটা বিজনেস তবে সব কিছুই আগের মতো থাকবে, এখানে টাকা পয়সা থাকবে, ক্রেতা থাকবে, বিক্রেতা থাকবে এবং ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য প্রডাক্ট থাকবে। তাহলে পার্থক্য কোথায়? আছে, কনভেনশনাল বিজনেস প্রতিষ্ঠান গুলো প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করতে চায়। সুতরাং তাদের একটা চিন্তা থাকে, কিভাবে প্রডাক্ট কিংবা সার্ভিসটা বেশি দামে বিক্রয় করা যায়, কিংবা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই বিজনেস এর একটা বড়ো শর্তটা হলো এইভাবে চিন্তা করা যাবে না। কোন প্রডাক্ট কিংবা সার্ভিস ই বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না। প্রডাক্ট কিংবা সার্ভিস এর মূল্য হবে অনেক কম, যতটুকু না হলেই নয়। আচ্ছা, বিজনেস রান করতে হলে ক্যাপিটাল লাগে, লাগবেই, সেটা আসবে। সোসাল বিজনেস এবং কনভেনশনাল বিজনেস কনফ্লিক্টিং নয়, বরং পাশাপাশি থাকতে পারে। মাইক্রোসোফট ইচ্ছা করলে এইটা সোসাল বিজনেস চালাতে পারে। কিভাবে সেটা বলি, ধরা যাক, আমার ২০ লক্ষ টাকা আছে, সেটা দিয়ে আমি কনভেনশনাল বিজনেস করছি, সব ঠিক আছে। কিন্তু আমি এর পাশে আরও ৫ লক্ষ্য টাকা দিয়ে একটা সোসাল বিজনেস অপেন করতে পারি, সেটা হবে বেনিফিট ম্যাকিং এর জন্য। আমার বিজনে একটা প্রডাক্ট তৈরি করবে, সেটা হবে গুনগত, কিন্তু দাম কম। একটা সোপ তৈরি করলে সাধারণত ভেতরের প্রডাক্টের দাম সাথে লুক্রেটিভ র‍্যাপার, এডভারটাইসমেন্ট এবং আরও নানা রকম ইস্যু জড়িত থাকে, যার ফলে সোপটির কস্টিং বেরে যায়, এবং দামও অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু সোসাল বিজনেস সেগুলো নিয়ে চিন্তা করবে না। এই সাবানের জন্য ভাল লুক্রেটিভ র‍্যাপার দরকার নেই, বরং তার দরকামর সাবানের গুণগত মানটা ঠিক রাখা। তো আমার প্রডাক্ট/সার্ভিস এবং ক্রয় বিক্রয় চললো, আমি বলেছি আমি লাভ করবো না, সুতরাং আমি যা ইনভেস্ট করেছি, বছর শেষে আমার ইনভেস্টমেন্ট এর টাকাটা একই থাকছে, এভাবে টাকাটা রিসাইকল হতেই থাকবে। কিন্তু আমার বেনিফিট হবে, আমি কতগুলো ভোক্তা পেলাম, আমার কম্পানিতে কতগুলো লোকের কর্ম সংস্থান হলো ইত্যাদি ইত্যাদি। সোসাল বিজনেস মূল ব্যাপারটি হলো সমাজের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা এবং সেটা সমাধান করা এবং সেটি করার জন্য একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। সামাজিক সমস্যা গুলো কেমন হতে পারে, যেমন বেকার সমস্যা। আমরা সোসাল বিজনেস এর মাধম্যে বেকার সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি। আমাদের সামাজে দরিদ্র জনসাধারণ এর সংখ্যা বেশি, তারা যাতে কম টাকায় ভাল প্রডাক্ট এবং সার্ভিস পায়, তাও সোসাল বিজনেস এর লক্ষ্য হতে পারে।

যাহোক মুহাম্মদ ইউনুস এর এই আইডিয়াটা আমার অনেক বেশি ভাল লেগেছে। উনি বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন, এবং এই সোসাল বিজনেস এর বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। জিনিসটা দেখে ভাল লাগছে, বাংলাদেশের তেলাপোকা গুলো তাকে সম্মান না দিলেও বাইরের পৃথিবীর সবাই তাকে সম্মান করে, তিনি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই যান তা নয়, বিভিন্ন বড়ো বড়ো অর্গানাইজেশন এর প্রধান, দেশ প্রধান সবার সাথেই তার সখ্যতা আছে দেখা যায়। তিনি যে কত বড়ো মাপের মানুষ সেটা আমরা মনে হয় এখনো বুঝি নি, বুঝলে গ্রামীণ ব্যাংক এর সিইও পদ থেকে তাকে সরাতে চাইতাম না। মুহাম্মদ ইউনুস আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু কোনটিই কিন্তু তার নিজস্ব ব্যক্তিমালিকানাধীন নয়। তার নিজের স্বত্ব নেই, বরং স্বত্ব সেই প্রতিষ্ঠানের। তিনি ইচ্ছে করলেই কোটি কোটি টাকা নিজের পকেটে রাখতে পারতেন, কিন্তু তার সেই মানি অবসেসিভনেস নেই। তিনি বেনিফিট চান, প্রফিট নন।

আমার কেন জানি মনে হয়, আমি যদি দেশের বাইরে যাই, তাহলে কেও যদি জিজ্ঞাস করে, তুমি কোন দেশ থেকে এসেছো, আমি যদি বলি বাংলাদেশ, তাহলে সে হয়তো চোখ বড়ো বড়ো করে বলবে, ওয়াও তুমি মুহাম্মদ ইউনুস এর দেশে থেকে এসেছো।..

দীর্ঘজীবী হোন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস।

সম্রাট হুমায়ুন এবং আমার ফ্যান্টাসি

সম্রাট হুমায়ুন সতীদাহ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি একবার ঘোড়া-ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে প্রজাদের দেখতে বের হয়েছিলেন, সামনে শ্মশানঘাট এ সতীদাহ হওয়া দেখে ফরমান জারি করে সতীদাহ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাধাদেয় জওহর নামে এক মশক-বাহক,সে সম্রাট এর পানি সরবরাহ করতো, “আলমপনা, গোস্তাকি মাফ হয়, আপনার সমস্ত প্রজা হিন্দু। আপনি ওদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে তারা বৈরি হয়ে উঠবে। আপনার জন্য শাসনকার্য পরিচালনা দুষ্কর হবে।”

 

আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল আল মুকাররাম, জামিই সুলতানাত-ই-হাকিকি ওয়া মাজাজি, সৈয়দ আল সালাতিন, আবুল মোজাফ্ফর নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ পাদশাহ, গাজি জিল্লুল্লাহ

 

কত বড়ো নামরে বাবা। এইটা ছিল সম্রাট হুময়ানের নাম।

 

মোঘল সম্রাটদের মধ্যে হুমায়ুন আমার খুব প্রিয়। লোকটা অনেক ভাল ছিলেন, তবে এই ভাল থাকার জন্য যে বৈশিষ্ট্য গুলো থাকা প্রয়োজন, তা এই সময়ের ভালত্ব দিয়ে বিচার করলে চলবে না। সিংহাসনে বসেই সম্রাটদের প্রথম কাজ থাকে তার শত্রুদের দমন করা। এর মধ্যে তাদের যদি ভাই থাকে, শুরুতেই ভাইদেরকে হত্যা করা আবশ্যক ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। এবং এই জন্য তিনি অনেকবার বিপদে পরেছেন, রাজ্য হারিয়েছেন। কিন্তু বারবার ক্ষমা করে দিয়েছেন। জিনিসটা বিরল। তিনি যখন রাজ্য হারা হয়ে পথে পথে, তখন তাকে পারস্য রাজা সাহায্য করেছিলেন। তার প্রথম কথায় ছিল, আপনি ভাইদের হত্যা করেননি কেনো? কি আশ্চর্য না? হুমায়ুনের ছোট ভাই কামরান মির্জা বারবার তাকে বিপদে ফেলেছেন, হুমায়ুনকে বন্দি করে হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন অনেকবার। কিন্তু তিনি বারবারই তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সম্রাটদের অনেক সময় মন অনেক শক্ত থাকতে হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ওনার মন অনেক দুর্বল ছিল। তবে হুমায়ুন অনেক ভাবে সৌভাগ্যবান ছিলেন। তাকে সবাই ভালবাসতো। তিনি সবার ভালবাসা না পেলে হয়তো মোঘল আমল হুমায়ুনের পরেই বিলুপ্ত হয়ে যেতো। সম্রাট বাবর হুমায়ুনের রোগ নিজের শরীরে নিয়ে পুত্রকে মুক্ত করেছিলেন। সেই গল্প আমরা সবাই জানি। তারপর তার সবচেয়ে ভাল সহচর ছিল বৈরাম খাঁ। তার সেনাপতি। বৈরাম খাঁ না তাকে সাহায্য না করলে হয়তো তিনি কখনোই সাম্রাজ্য ফিরে পেতেন না। ইতিহাসে দেখা যায়, হুমায়ুন বারবার পরাজিত হচ্ছেন। এর পেছনে অবশ্য তার খামখেয়ালী আর দুর্বল মনকে অনেকেই দায়ী করবেন। কিন্তু সেগুলোকে আমি খুব একটা খারাপ চোখে দেখি না। কারণ সেগুলো আসলে তাকে অনেক বেশি মহান করে তুলেছেন। তাকে তার শত্রুও ভাল বাসতেন। শের খাঁ যখন তাকে পরাজিত করার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, তখন তার সহচরদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল তারা যাতে কোন ভাবেই হুমায়ুনকে হত্যা না করে, তাকে যেন পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়। এইজন্য অবশ্য হুমায়ুন পর পর দুইবার বেচে যায়। শের খার সৈন্যরা দেখছে, হুমায়ুন পালিয়ে যাচ্ছে, ইচ্ছে করলেই তীর ছুড়ে তাকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু তা তারা করছে না, জিনিসটা সত্যিই অন্যরকম। শের খা নানা রকম ফন্দি ফিকির করে, হুমায়ুনকে পরাজিত করেন, হুমায়ুন ঘোড়া নিয়ে পানিতে ঝাপ দেন, ঘোড়া পানিতে ডুবে যায়, তখন নাজিম নাকে এক ভিস্তিওয়ালা তাকে বাতাস ভর্তি এক মশক ছুড়ে দেয়। হুমায়ুনের জীবন বাচানোর জন্য হুময়ান কথা দেয়, তাকে একদিনের জন্য তার সিংহাসনে বসাবেন। মজার ব্যাপার হলো সম্রাট সে কথা ভুলে যায় না, তিনি যখন দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তখন সেই ভিসতিওয়ালকে একদিনের জন্য সিংহাসনে বসান। হুমায়ুন মশক ধরে নদীর ওপারে উঠে খুব অসুস্থ হয়ে পরেন। তখন তাকে বাচায় লছমী বাই নামের এক সাধারণ মহিলা।

 

এভাবে নানাভাবে হুমায়ুন অন্যের ভালবাসা পেয়েছেন। তিনি নিশ্চয় মানুষটা অন্যের ভালবাসা পাওয়ার মতো ছিলেন।

তবে হুমায়ুন খুব খামখেয়ালী ছিলেন, এই বিষয়টি আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে। মোঘলদের অনেক দোষত্রুটি ছিল, নানা জন্য নানা ভাবে ব্যাখ্যা করছেন, কারো লেখা পড়লে মনে হবে এদের মতো নিষ্ঠুর কেও হতে পারে না, আবার কারো লেখায় তারা অনেক মহান ছিলেন। তবে আমি যতটুকু ইতিহাস জানি, খুব বেশি জানি না, ক্লাস থ্রি থেকে-নাইন পর্যন্তু যতটুকু ইতিহাস পড়েছি, তার সবই প্রায় ভুলে গেছি, সেগুলোর মধ্যে মোঘল আমলের সম্রাটদের মধ্যে হুমায়ুনকে খুব বেশি ভাল লেগেছে। সবদিক থেকে তিনি অনেক ব্লেজড ছিলেন।

 

মোঘল আমল নিয়ে আমি একটু পড়াশোনা করছি, মাঝে মাঝে নিজেকে সম্রাট সম্রাট মনে করতে ইচ্ছে হয়। তবে আমি মনে হয় হতে পারতাম না, সম্রাট হতে হলে তাদেরকে অনেক নিষ্ঠুর হতে হয়, তা হয়তো হতে পারতাম না। কাওকে হাতির পায়ের নিতে পিষ্ট করতে কিংবা গাধার চামরা ভেতর ভরে তা শুকিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর হওয়া খুবই কঠিন। কিন্তু এই ব্যাপার গুলো তাদের কাচে খুব সহজ ছিল। তাদের আত্মসম্মান ছিল প্রচুর। কন্যাকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে নিজে হত্যা করাটা বেশি ভাল মনে করতেন, তার মেয়ে এই নয় যে সে কন্যাকে ভালবাসেন না, হুমায়ুনের কন্যাকে অনেক ভালবাসতেন।

 

সম্রাটের মুখের কথায় আইন, কি আশ্চর্য একটা ব্যাপরই না ছিল। তিনি একটা ফরমান জারি করলেই সেটা আইন, সবাইকে তা শুনতে হবে। না শুনলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। রাজা বাদশাহদের জীবনে সুখ সাচ্ছন্দ্যের মধ্যে দিয়ে কেটেছে তা সত্যি কিন্তু তাদের জীবন নিয়ে সংশয়, মৃত্যুর ভয়াবহতা, যুদ্ধবিগ্রহ, রাজ্যদখল, প্রজা পালন এইসব ব্যাপারে একটা ভজঘট থেকে যা বুঝা তা হলো, তারা খুব বেশি সুখি ছিলেন না। তাছাড়া প্রজাদের জন্য তারা যে অনেক করতেন, তাও কিন্তু খুব  বেশি দেখা যায় না। বরং আমার কাছে কেন জানি মনে হয়, প্রজারা আসলে রাজাদের পালত।

 

তবে সেই মধ্যযোগের চেয়ে আমরা আসলে অনেক বেশি সুখে আছি, পৃথিবীতে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি কখনোই ছিল না। কখনো না কখনো যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই ছিল। এখনো তাই। বরং অতীতের চেয়ে আমরা বেশ সভ্য হয়েছি।

 

তবে আমার কেন জানি মনে হয়, হুমায়ুন সম্রাট না হয়ে যদি কবি হতেন, সাম্রাজ্য অন্যের হাতে দিয়ে তিনি নিজে পড়াশোনা করতেন, শিল্প সাহিত্য নিয়ে বসে থাকতেন তাহলে হয়তো আমরা একজন কবি পেতাম/সাহিত্যিক পেতাম।

অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড কনসেপ্ট এবং আমার আলসেমি

আমি লোকটা প্রচুর অলস। তার আগে বলে নেই, আমি একজন প্রোগ্রামার। তবে প্রোগ্রামার বললেই সবার মনে হয়, সি, পাইথন, হাসকেল কিংবা এসেম্বলিতে কোড লিখে, আজিব একটা বস্তু, চোখে বিশাল সাইজ চশমা পরে, অসামাজিক, ইনট্রোভার্ট এবং ফ্যাশনেবলি চ্যালেঞ্জড এবং প্রচণ্ড অলস কাওকে। তবে আমি এরকম না, আমি হচ্ছি অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামার। আমি জাভাতে কোড লিখি, এবং প্রত্যেকটা অবজেক্ট ইনট্যনসিয়েট করে করে ডট দিই। আমি আসলে ডট ছাড়া মোটামুটি অচল। সব কিছুর জন্য রেফারেন্স লাগে।

গল্পটা বলি, আমি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন থেকে টাকা তুলতে গেছি। সোনালী ব্যাংক এ ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন এর সাইনবোর্ড দেখেছি, সুতরাং এখান থেকে তুলা যাবে। গেলাম, কিন্তু ওনাদের সিস্টেমে সমস্যা। অন্য ব্যাংক এ রেফার করলো। গেলাম ব্র্যাক ব্যাংক এ। গিয়ে প্রথম ডেস্কে এ জিজ্ঞাসা করতেই  পাঠিয়ে দিল ৫ নাম্বার ডেস্কে। সেই ডেস্কে এক ভদ্রমহিলা (মহিলা বলা কি ঠিক হবে (???) ) বসে আছেন। তাকে গিয়ে বললাম আমি টাকা তুলতে চাই। ভদ্রমহিলা আমাকে একটা ফরম ধরিয়ে বললেন এইগুলা পূরণ করে দেন। কিন্তু ফরম এর এতোগুলা ঘর দেখে আমার মনে হলো, কি আশ্চর্য এতো গুলা জিনিস আমাকে পূরণ করতে হবে, যিনি আমাকে টাকা পাঠিয়েছেন, উনি তো আমাকে একটা কোড ছাড়া আর কিছু দেন নি। আমি চিন্তা করতে থাকলাম, আর উনি আমার ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের আইডি-কার্ড চাইলেন, আমি বললাম, আমার তো ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের আইডি কার্ড নেই, তখন তিনি আমার ভোটার আইডি কার্ড চাইলেন। আমি তাকে বললাম, আমার তো ভোটার আইডি কার্ড নেই। উনি চোখটা কপালে তুললেন। বললেন আপনার ভোটার আইডি কার্ড নেই, কি আশ্চর্য। আসলে নেই, কারণ আমি শুরুতেই বলেছি আমি অনেক অলস, আসলেও তাই। এই জন্য ভোটার আইডি কার্ড  নাই। তখন উনি বললেন আর কোন আইডি? আমি আমার ইউনিভার্সিটির আইডি দিলাম। উনি সেটা নেড়ে চেড়ে বলেলেন, এইটার তো মেয়াদ শেষ। মেয়াদ তো শেষ হবেই, আমি পড়ি চতুর্থ বর্ষে আইডি কার্ড হচ্ছে দ্বিতীয় বর্ষের। পরেরটা ইস্যুই করি নাই। কতো কষ্ট, হলের অফিসে যাও, তারপর গিয়ে দেখতে হবে, হলের অফিসে যিনি কার্ড দেয়ার হর্তাকর্তা, তার সময় সুযোগ, নাই বা তুললাম । সুতরাং উনি বললেন, আইডি কার্ড ছাড়া তো হবে না। আমি কি করি? উনি আবার জিজ্ঞাস করলেন, ব্র্যাক ব্যাংক এ আমার কোন কোন একাউন্ট আছে কিনা, আমি  বললাম না। অনেকক্ষণ পর মনে হলো হ্যাঁ আছে তো, আমার তো একটা ব্র্যাক ব্যাংক এ একটা একাউন্ট আছে, আমি না কেন করলাম। তারপর তাকে বললাম আমার তো একাউন্ট আছে, উনি আমাকে বললেন,একাউন্ট নাম্বার কত? আমি সুন্দর করে বললাম জানি না তো? উনি আবারও চোখ কপালে তুলে বললেন, আপনার একাউন্ট নাম্বার মনে নেই? তখন আমার মনে হলো, আমার তো একটা ভিসা কার্ড আছে, তাকে বললাম,তাকে আমার ভিসা কার্ড টা দিলাম। তখন উনি কষ্ট করে আমার কার্ডটা নিয়ে গিয়ে আমার একাউন্ট ইনফরমেশন এবং আইডি কার্ড প্রিন্ট করে নিয়ে আসলেন। আমি এর মধ্যে ফরমে আমার নাম এবং কোড টা লিখেছি। উনি এসে বললেন, বাকি গুলো কই? বাকি গুলো তো আমি জানি না। উনি চোখ আকাশে তুললেন যখন জানলেন, যে আমাকে টাকা পাঠিয়েছে তার নামটাও জানি না। উনি বেশ অবাক হয়েই বললেন, আপনাকে একজন টাকা পাঠিয়েছে আর আপনি তার নাম জানেন না। কিছুক্ষন হ্যাঙ হয়ে থেকে আমাকে প্রশ্ন করতেই থাকলেন। আমি বললাম জানি না। আমার আসলে মনে পরছিল না। সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন যখন দেখলেন আমার বর্তমান ঠিকানার জায়গাটাও খালি। আমি এখন নীলক্ষেত এ থাকি, কিন্তু এইখানের ঠিকানা জানি না। জানার দরকার মনে হয় নাই। তারপর আর কি উনি শুধু কোডটা নিয়ে কম্পিউটার থেকে বাকি সব ইনফরমেশন নিয়ে নিজেই ফিলআপ করলেন। তারপর আমার সিগনেচারটা দেখিয়ে বললেন, এইটার মতো করে এখানে এখানে সাইন করেন। উনি হয়তো ভাবছে আমি নিজের সাইনটাও ভুলে বসে আছি। তবে এর মাঝে একটা চরম ইনসাল্টিং কথা বলেছেন, সেটা না হয় নাইবা বললাম।

 

যাহোক, আমি শেষ পর্যন্ত টাকাটা তুলতে পারলাম। ভদ্রমহিলাকে একটা থ্যাংকস। কিন্তু উনি আসলে অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড কনসেপ্ট জানেন না। জানলে আমাকে এতো প্রশ্ন করতেন না। শুধু মাত্র আমার কোড টা নিলেই সব কিছু জানতে পারতেন।

আমি যে অলস তা নিয়ে আরেকটু বলি, সেটা হলো যে ভদ্রলোক আমাকে টাকা পাঠিয়েছেন, উনি আমাকে দুই সপ্তাহ থেকে মেইল করেই যাচ্ছেন যেন আমি যেন গিয়ে টাকাটা তুলি। উনি টাকা পাঠানোর তিন সপ্তাহ পর আমি টাকা তুলে আনলাম।

শেষে বলি তুমি যদি অলস না হও, তুমি আসলে খাটি প্রোগ্রামার হতে পারবে না।